দ্য লস্ট পেইন্টিং
লেখক: শিমুল মন্ডল
শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব
১
সাল ২২৩০। মেট্রোপলিসের হৃৎপিণ্ডে ‘মেমোরি কর্প’-এর আকাশচুম্বী ভবনটার সামনে দাঁড়িয়ে মিয়াকোর জন্য অপেক্ষা করছিল থিয়া। নির্দিষ্ট সময়ের কিছুটা আগেই সে পৌঁছে গেছে, কিন্তু তারপর দশ মিনিট পেরিয়ে গেলেক মিয়াকোর কোনো পাত্তা নেই।
সময় কাটানোর জন্য চত্বরের বিশাল হলোগ্রাফিক বিলবোর্ডগুলোর দিকে নজর দিল থিয়া। চটকদার সব বিজ্ঞাপনে ঠাসা সেগুলো। বেশির ভাগই মেমোরি ট্রাভেল সংক্রান্ত।
মানুষ একসময় সমুদ্র ভ্রমণ করত, পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার রোমাঞ্চ খুঁজত। কিন্তু এই তেইশ শতকে এসে পৃথিবীটা বড্ড ছোটো হয়ে গেছে। রহস্য যা কিছু অবশিষ্ট আছে, তা কেবল মানুষের করোটির ভেতরে, ধূসর মস্তিষ্কের জটিল ভাঁজে ভাঁজে। এখনকার পর্যটন তাই আর মানচিত্র বা পাসপোর্টের উপর নির্ভরশীল নয়। বরং রোমাঞ্চের নতুন ঠিকানার নাম এখন ‘স্মৃতি’ আর তার অধিপতি হল এই মেমোরি কর্প।
বছর দশেক আগে শুরু হয় এই মেমোরি কর্প-এর। শুরুটা তারা করেছিল বিখ্যাত সব সাহিত্যিক আর পেইন্টারের কল্পনার জগতের ভার্চুয়াল রিয়েলিটি দিয়ে। তারপর ধাপে ধাপে এসেছে ভার্চুয়াল মেমোরি এক্সপিরিয়েন্স, যেখানে চাইলেই সেলেব্রিটি শিল্পী, সাহিত্যিক বা আর্টিস্টদের সিন্থেটিক স্মৃতির জগতে ভ্রমণ করা যায়। স্বাদ নেওয়া যায় তাদের মনোজগতের। আর একদম নতুন যেটা এসেছে, সেটা হল অথেন্টিক মেমোরি এক্সপিরিয়েন্স। এটার ব্যাপারে থিয়া খুব বেশি কিছু জানে না। শুধু শুনেছে, এখানে নাকি সিন্থেটিক মেমোরির বদলে একদম রিয়েল হিউম্যান মেমোরির মধ্যে ভ্রমণ করা যায়।
“থিয়া!”
একটা পরিচিত কণ্ঠে থিয়ার চিন্তার সুতো ছিঁড়ে গেল। ভিড় ঠেলে মিয়াকো এগিয়ে আসছে।
“অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছ?” হাসিমুখে সামনে এসে দাঁড়াল মিয়াকো।
“খুব বেশি সময় হয়নি। কিন্তু তোমার দেরি কেন?”
মিয়াকো চত্বরের এককোণে কাচের দেওয়াল-ঘেরা কাফেটেরিয়াটা দেখিয়ে চোখের ইশারায় বলল, “তোমার সঙ্গে জরুরি কথা আছে। চলো, কফি খেতে খেতে বলছি।”
কাফেতে বসে ধোঁয়া-ওঠা কফিতে একটা চুমুক দিয়ে টুকটাক সাধারণ কথাবার্তার পর মিয়াকো জিজ্ঞেস করল, “ইভান গ্রোচের লস্ট পেইন্টিং-এর ব্যাপারে তো জানো নিশ্চয়ই?”
“রাশিয়ান পেইন্টার ইভান গ্রোচের ‘দ্য লস্ট পেইন্টিং’?”
“হ্যাঁ।”
“হ্যাঁ, জানি তো। পেইন্টিং-এর ব্যাপারে ইনটারেস্ট আছে আর ‘দ্য লস্ট পেইন্টিং’-এর কথা জানে না, এমন কাউকে পাবে না তুমি। আর আমি তো আমার ফাইনাল ইয়ার থিসিসটাই করেছি ইভান গ্রোচের কাজের উপরে।”
“আমারও সেটাই মনে পড়ছিল। তবু নিশ্চিত হলাম।”
ইভান গ্রোচের লস্ট পেইন্টিং একটা বিখ্যাত রহস্য। ইভানের অভ্যাস ছিল প্রতিটা ছবিতে সাইন করার সময় একটা সংখ্যাক্রম লিখে দেওয়া। তার মৃত্যুর পর এই ক্রম অনুসরণ করে এখন পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার ছবি আবিষ্কার হয়েছে। কিন্তু তার মধ্যে ৭৩৩ নম্বরের কোনো ছবি পাওয়া যায়নি। এই ব্যাপারে নানানরকম মতবাদ আছে। কেউ বলে, ছবিটা হারিয়ে গেছে। কেউ বলে, হয়তো ইভান ভুলে এই নাম্বারটা স্কিপ করে গেছে।
“কিন্তু হঠাৎ এই কথা কেন?” থিয়ার চোখে কৌতূহল জাগে।
“তুমি তো জানো, আমি ন্যাশনাল আর্কাইভে আছি। সেখানে পুরোনো অনেক ফাইলই আমাকে ঘাঁটতে হয়। এবারে সেই কাজ করতে গিয়ে আমি একটা অদ্ভুত জিনিস আবিষ্কার করেছি।” বলে মিয়াকো।
মনের উত্তেজনাটা লুকিয়ে রাখতে পারে না থিয়া। সোজা হয়ে বসে জিজ্ঞেস করে, “তুমি কি ৭৩৩ নম্বর ছবিটা পেয়েছ?”
“না। ঠিক তা নয়। তবে সেটাকে খুঁজে পাবার একটা উপায় সম্ভবত পেয়েছি।”
মিয়াকো জ্যাকেটের ইনার পকেট থেকে একটা প্রিন্টেড ছবি বের করে থিয়ার দিকে এগিয়ে দিল। “দ্যাখো তো, এই ছবিটা কি তুমি আগে দেখেছ?”
থিয়া ছবিটা হাতে নিয়ে ভালো করে খুঁটিয়ে দেখল। একটা সেকেলে ধাঁচের স্টুডিয়ো রুম; একরাশ রং, তুলি আর ক্যানভাসের মাঝে একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ বসে আছেন। মানুষটা স্বয়ং ইভান গ্রোচ।
“এটা তো ইভান গ্রোচের স্টুডিয়োতে তোলা মনে হচ্ছে। কিন্তু না, এই ছবি আমি আগে দেখিনি!”
“ভালো করে লক্ষ করে দ্যাখো, ইভানের পেছনে একটা ক্যানভাসে একটা অর্ধসমাপ্ত ছবি দেখা যাচ্ছে।”
থিয়া তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে লক্ষ করল। আর তারপরেই তার চোখে-মুখে একটা বিস্ময় ফুটে উঠল। “আরে! ওটা তো ইভানের বিখ্যাত ‘ট্রি অব মিউজ়িক’ মনে হচ্ছে!”
“একদম ঠিক ধরেছ। এই ছবিটা যখন তোলা হয়, তখন সবে ট্রি অব মিউজ়িক আঁকায় হাত দিয়েছেন ইভান। এটা নাম্বার কত ছিল, বলো তো?’
“সম্ভবত… ৭৩২…” একটু ভেবে বলল থিয়া।
“বাব্বা, একদম ঠিক বলেছ।” মিয়াকো বাহবা দেয়।
“কিন্তু এটার সঙ্গে লস্ট পেইন্টিং-এর কী সম্পর্ক?”
“সম্পর্ক আছে, থিয়া। সেটা বলছি। তবে তার আগে বলো, ধরো, যদি ৭৩৩ নম্বর ছবিটা বা অন্তত সেটার একটা অথেন্টিক কপি পাওয়া যায়, তবে কী হবে?”
“পুরো দুনিয়ায় আলোড়ন পড়ে যাবে, মিয়াকো। কেমন আলোড়ন, সেটা তুমি ভাবতেও পারবে না।”
“আমি ঠিক সেজন্যই আজ তোমাকে ডেকেছি। তুমি সাহায্য করলে আজকেই ছবিটা রিকভার করার একটা চেষ্টা করতে চাই।”
“আজকেই? কোথায়?” থিয়ার গলায় উত্তেজনা।
মিয়াকো আঙুল তুলে মেমোরি কর্প-এর প্রকাণ্ড ভবনের দিকে ইশারা করে বলল “ওই ওখানে।”
২
“মেমোরি কর্পে? তুমি কি মজা করছ?” থিয়া অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
“মজা নয়, আমি সিরিয়াস। মেমোরি কর্প-এর ডেস্টিনেশন লিস্টে যে ইভান গ্রোচের মেমোরি ওয়ার্ল্ড যোগ হয়েছে, সেটা শোনোনি?”
“শুনেছি। কিন্তু সেসব সিমুলেটেড মেমোরি মানে মেকি জিনিস।”
“না না। তুমি সিন্থেটিক মেমোরির কথা বলছ। ওটা তো ছিলই, এবারে যোগ হয়েছে ইভানের অথেন্টিক মেমোরি ওয়ার্ল্ড। মেমোরি কর্প কোনো একটা ভাবে ইভানের ব্রেনটা জোগাড় করেছে।”
‘“বলো কী, তা-ই নাকি? কিন্তু অথেন্টিক হলেই-বা কী আসে যায়? ওখানে ওই ছবি তুমি খুঁজে পাবে কীভাবে?”
“অথেন্টিক মেমোরি ওয়ার্ল্ডে শিল্পীর কল্পনা ছাড়াও বাস্তব স্মৃতির জগতেও ঘোরা যায়। যদি ৭৩৩ নম্বর ছবিটার অস্তিত্ব থেকে থাকে, তবে ইভানের স্মৃতির মধ্যেও সেটার অস্তিত্ব নিশ্চয়ই থাকবে।”
“এটা রীতিমতো পাগলাটে চিন্তা!”
“একবার একটা চেষ্টা তো করে দেখি, চলো। আর যদি খুঁজে না-ও পাই, তাহলেও ইভানের মনোজগতে একটা ভ্রমণ হয়ে যাবে। আশা করি, সেটাও খারাপ লাগবে না। এখন চলো।”
কফি শেষ করে থিয়াকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে একরকম টেনে নিয়েই মেমোরি কর্পে ঢুকে পড়ল মিয়াকো। কাউন্টারে পেমেন্ট সেরে ইভানের স্মৃতির জন্য নির্দিষ্ট হল রুমের দিকে হাঁটতে হাঁটতে থিয়া জিজ্ঞেস করল, “কাজটা তো তুমি একাই করতে পারতে?”
“আরে, তুমি হলে ইভানের ব্যাপারে আমার জীবন্ত গাইড বুক। আর তা ছাড়া অন্য একটা কাজেও তোমাকে প্রয়োজন হবে।”
“কী কাজ?”
“আগে ছবিটা পাই কি না দেখি। আপাতত ইভানের হলটা আগে খুঁজি, চলো।”
হল রুমটা খুঁজে পেতে অবশ্য তেমন সমস্যা হল না। টিকিট দেখিয়ে সেখানে প্রবেশ করতেই দেখা গেল, নীল মায়াবী আলোয় সারি সারি ‘মেমোরি পড’ ফাঁকা পড়ে আছে। এগুলো দেখতে অনেকটা স্বচ্ছ কাচের কফিনের মতো, যার ভেতরে শুয়ে অন্য জগতের স্বাদ নিতে হয়।
ওদের দেখতে পেয়ে একজন টেকনিশিয়ান এগিয়ে এসে স্বাগত জানিয়ে দুটো পড দেখিয়ে দিল। দুজন পরে শুয়ে পড়তেই দুটো স্বচ্ছ কাচের হেলমেট এসে ওদের মাথার সঙ্গে যুক্ত হল।
নিজের কনট্রোল প্যানেলের সামনে গিয়ে বসে টেকনিশিয়ান বলল, “পুরো ব্যাপারটা হবে একটা স্বচ্ছ স্বপ্নের মতো। আপনাদের ভ্রমণ শুরু হবে ইভানের মস্তিষ্কের ক্রিয়েটিভ সিন্যাপটিক জ়োন বা কল্পনাকেন্দ্র থেকে। সেখান থেকে চাইলে আপনারা নিয়ো-কর্টেক্স বা বাস্তব স্মৃতি অংশে যেতে পারবেন।”
“কীভাবে?” জিজ্ঞেস করল মিয়াকো।
“মেমোরি ওয়ার্ল্ডে চলাচলের মাধ্যম হল ভাবনা। ইভানের জীবনের কোনো বিশেষ দিন বা ঘটনার কথা ভাবলেই আপনারা সেই স্মৃতিতে পৌঁছে যাবেন। নিজেদের মস্তিষ্কে যেভাবে আমরা পুরোনো কোনো ঘটনা বা স্মৃতিকে খুঁজি, ঠিক সেভাবে।”
টেকনিশিয়ান একটু থামল। কনট্রোল প্যানেল কিছু কমান্ড দিয়ে তারপর ওদের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল, “আপনারা কি আলাদা ভ্রমণ করবেন, নাকি একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে চান?”
“যুক্ত থাকতে চাই।” উত্তর দিল মিয়াকো।
“ঠিক আছে। আমি আপনাদের নিউরাল লিংক সিনক্রোনাইজ় করে দিচ্ছি। তাহলে আপনারা দুজন একই সঙ্গে একই জিনিস উপভোগ করতে পারবেন।”
“আমরা কতক্ষণ সময় পাচ্ছি?”
“সেটা আপেক্ষিক। বাস্তব পৃথিবীর ৩০ মিনিট আপনাদের নিউরাল ইনটারফেসে প্রায় ৩ থেকে ৬ ঘণ্টার মতো অনুভূত হবে। একে আমরা ‘টাইম ডাইলেশন’ বলি। সময় শেষ হলেই সিস্টেম আপনাদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিকল করবে।”
টাইম ডায়ালেশনের ব্যাপারটা থিয়া ঠিক বুঝতে পারল না। কিন্তু কেমন যেন একটা অজানা আশঙ্কা বোধ করল। সে আলতো স্বরে জিজ্ঞেস করল, “আর যদি সময়ের আগে নিজেরাই ফিরে আসতে চাই?”
“সেক্ষেত্রেও আপনারা শুধু ভাবলেই হবে। ট্রাভেলে থাকা অবস্থায় আপনাদের ব্রেনওয়েভ সার্বক্ষণিকভাবে মনিটর করা হবে। তাই আপনারা বের হতে চাইছেন, বুঝতে পারলেই আপনাদের ফিরিয়ে আনা হবে।”
কথা শেষ হলে টেকনিশিয়ান প্রক্রিয়া শুরু করলেন। থিয়া অনুভব করল, তার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা শিরশিরে ঠান্ডা স্রোত নেমে যাচ্ছে।
“আপনাদের মেমোরি ট্রাভেল শুভ হোক।” বলে টেকনিশিয়ান কোনো একটা বাটন চেপে দিলেন।
কয়েক সেকেন্ডের এক তীব্র ঝিমুনি, মস্তিষ্কের ভেতর এক অস্ফুট বিদ্যুৎ তরঙ্গ, আর তারপরেই চারদিকের পরিচিত জগৎটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে এক নিমেষে পালটে গেল।
৩
থিয়া যখন চোখ মেলল, তার মনে হল, সে কোনো তরল রঙের সমুদ্রে ডুবে আছে। কিন্তু পরক্ষণেই সে বুঝল, সে শ্বাস নিতে পারছে। সে দাঁড়িয়ে আছে এক আদিগন্ত বিস্তৃত উপত্যকায়। এখানকার আকাশটা ঠিক আকাশের মতো নয়; বরং কোনো এক শিল্পীর ক্যানভাসে ঢেলে-দেওয়া উজ্জ্বল বেগুনি আর ফিরোজা জলরঙের মিশেল। সেই আকাশে কোনো সূর্য নেই, অথচ চারদিক এক মায়াবী, অপার্থিব আলোয় উদ্ভাসিত।
“মিয়াকো! দ্যাখো!” থিয়া বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠল।
তারা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে কোনো ঘাস নেই। তার বদলে মাটির উপর বিছোনো রয়েছে হাজার হাজার নরম রুপালি পালক। প্রতিটি পালক বাতাসের দোলায় মৃদু বেহালার সুরের মতো শব্দ করছে। তাদের পায়ের চাপে সেই সুরগুলো মিলেমিশে এক অদ্ভুত ঐকতান তৈরি করছে।
সামনে বয়ে যাচ্ছে ইভানের আঁকা ‘দুঃখের নদী’। সেই নদীর জল ঠিক জলের মতো নয়; যেন কোটি কোটি টলটলে অশ্রুবিন্দু একসঙ্গে প্রবহমান। সেই স্রোতে হাত দিলেই কানে ভেসে আসে হাজার বছর আগের কোনো এক বিচ্ছেদকাব্য। নদীর ওপারে দাঁড়িয়ে আছে ইভানের বিখ্যাত ‘ট্রি অব মিউজ়িক’। বাতাসের মৃদু ঝাপটায় গাছের সবুজ পাতাগুলো পিয়ানোর রিদ্মে দুলছে এবং আকাশ থেকে বৃষ্টির বদলে ঝরে পড়ছে সোনালি ধূলিকণা।
দুজনে অনেকক্ষণ ধরে এই অপার্থিব সৌন্দর্য উপভোগ করল। তারপর একসময় মিয়াকো বলল, “থিয়া, চলো, এবারে ইভানের স্মৃতির দুনিয়ায় যাই।”
মুগ্ধ চোখে আকাশের দিকে চেয়ে ছিল থিয়া। চোখ ফিরিয়ে মিয়াকোর দিকে চেয়ে সে বলল, “হ্যাঁ, চলো। কিন্তু কীভাবে শুরু করব?”
“এখানে আসার আগে ইভানের স্টুডিয়োর ছবিটা তোমাকে দেখিয়েছিলাম, মনে আছে? ওখান থেকেই শুরু করি, চলো।”
মিয়াকো আর থিয়া দুজনেই চোখ বন্ধ করে ছবিতে দেখা স্টুডিয়ো ঘরটার কথা ভাবতে লাগল। হঠাৎ করেই কয়েক সেকেন্ডের এক তীব্র শূন্যতা অনুভূত হল। তারপর আবার যখন ওরা চোখ খুলল, দেখল, উপত্যকা মিলিয়ে গেছে। এবারে তারা দাঁড়িয়ে আছে একটা অগোছালো ছোটো ঘরের ভেতর।
ঘর জুড়ে ছড়ানো-ছিটোনো অসংখ্য রং আর অসমাপ্ত ক্যানভাস। একদিকে একটা কাঠের টেবিল, জীর্ণ চেয়ার আর একটা পুরোনো আমলের খাট। বাতাসের গন্ধে মেশানো রয়েছে তার্পিন আর তেলের এক তীব্র ঘ্রাণ, যা জানান দিচ্ছে, শিল্পী ঠিক এখানেই বাস করতেন।
ঘরের ভিতর এক অদ্ভুত স্তব্ধতা বিরাজ করছে। প্রতিটি ক্যানভাস, প্রতিটি রঙের টিউব যেন কারও অপেক্ষায় আছে। আর তার মধ্যেই একটা ইজেলে আটকানো ক্যানভাসে শোভা পাচ্ছে অসমাপ্ত ‘ট্রি অব মিউজ়িক’। দুজনে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল সেটার দিকে।
“অবিশ্বাস্য মিয়াকো, ঠিক যেন সেইদিনটিতে দাঁড়িয়ে আছি।” থিয়া উত্তেজিত গলায় বলল।
“হ্যাঁ, যেন একেবারে বাস্তব।”
“কিন্তু এখান থেকে লস্ট পেইন্টিং-এর সময়টাতে কীভাবে যাব? ছবিটা যে দেখতে কেমন ছিল, সেটাও তো জানি না যে, মনে মনে সেটার কথা ভাবব।” বলল থিয়া।
“হ্যাঁ। কিন্তু একটা উপায় আছে। ছবির বিষয়বস্তু না জানলেও এটা আন্দাজ করা যায় যে, ইভান নিশ্চয়ই ছবিটির নীচে স্বাক্ষর করে ৭৩৩ সংখ্যাটি লিখেছিলেন। কাজেই আমরা যদি সেই ৭৩৩ সংখ্যাটার কথা ভাবি আর সত্যিই যদি ইভান সেই ছবিটা এঁকে থাকেন তাহলে নিশ্চয়ই কাজ হবে।’
মনে মনে মিয়াকোর স্মার্টনেসের প্রশংসা না করে পারল না থিয়া। দুজনেই আবার চোখ বন্ধ করে সেই ৭৩৩ নম্বর সংখ্যাটার কথা ভাবতে শুরু করল। একটু মন দিয়ে ভাবতেই হঠাৎ সেই একই রকম শূন্যতার অনুভূতি ফিরে এল। তারপর শেষ চোখ মেলতেই দুজনে দেখল, ঘরের চেহারাটা এবারে কিছুটা বদলে গেছে। আর এবারে ইজেলের উপর এমন একটা ছবি দেখা যাচ্ছে, যেটা থিয়া এর আগে কোনো নথিপত্রে দেখেনি।
ছবিটার দিকে চেয়ে উত্তেজনায় থিয়ার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চাইল। এমন অদ্ভুত সুন্দর আর বিষণ্ণ ছবি থিয়া আগে কখনও দেখেনি। তবে ছবিটা ইভানের অন্য ছবির চেয়ে স্বতন্ত্র। এটা একটা মহিলার পোর্ট্রেট। সে ফিশফিশ করে বলল, “মিয়াকো, আমরা পেরেছি…”
মিয়াকোও অবাক বিস্ময়ে ছবিটা দেখছিল। সে বলল, “ভালো করে দেখে নাও থিয়া। প্রতিটি তুলির টান, রঙের বিন্যাস, সবটা তোমার মস্তিষ্কে গেঁথে নাও, যেন বাস্তবে ফিরে তুমি এটার একটা অবিকল কপি আঁকতে পারো।”
ছোটোবেলা থেকেই থিয়ার এই গুণটা আছে যে, যে-কোনো ছবি একবার দেখেই মনে রাখতে পারে আর স্মৃতি থেকে অবিকল আঁকতেও পারে। কলেজে থাকতে ওর এই প্রতিভার জন্য বন্ধুদের অনেক প্রশংসা পেত।
মিয়াকো যে এই কারণেই তাকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে, সেটা বুঝতে পারল থিয়া। কিন্তু এর পিছনে কি মিয়াকোর কোনো অসৎ উদ্দেশ্য আছে? না হলে এই ব্যাপারটা শুরুতেই বলল না কেন?
কিন্তু থিয়া কিছু বলার আগেই হঠাৎ করেই ঘরের ভিতর অদ্ভুত একটা পরিবর্তন হতে শুরু করল। পুরো ঘর কেমন যেন অন্ধকার হয়ে এল। মনে হল যেন কোনো এক অদৃশ্য শক্তি ঘরের প্রতিটা আলো, প্রতিটা রং শুষে নিতে শুরু করেছে।
“এসব কী হচ্ছে?” চমকে উঠে বলেন মিয়াকো।
ভয় পেয়ে চিৎকার করতে চাইল থিয়া, কিন্তু তার আগেই এক পলকে চারদিকের সমস্ত দৃশ্যপট মুছে গিয়ে এক সর্বগ্রাসী অন্ধকার নেমে এল।
৪
মেমোরি কর্প-এর অপারেশনাল কনট্রোল রুমে যুদ্ধের আবহাওয়া। দেয়াল জুড়ে-থাকা অতিকায় হলোগ্রাফিক মনিটরগুলোতে নীল আভার বদলে এখন লাল সংকেত বিপদঘণ্টার মতো লহমায় লহমায় জ্বলে উঠছে। অকল্পনীয় বিপর্যয় ঘটে গেছে আজ। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মেমোরি ট্রাভেল করতে গিয়ে নির্ধারিত সময়ের পরেও চেতনা ফিরে না-আসার মতো অঘটন ঘটেছে। বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য এরই মধ্যে লেভেল ফোর ইমার্জেন্সি প্রোটোকল জারি করা হয়েছে।
মিস্টার হ্যারিসন, মেমোরি কর্পোরেশনের সিইও, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম মুছতে মুছতে পায়চারি করছেন। তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে-থাকা চিফ টেকনিক্যাল অফিসার মার্কাস ভেনের মুখটা ছাইয়ের মতো ফ্যাকাশে।
“টাইম-ল্যাপ্স কতক্ষণ হল, মার্কাস?” হ্যারিসনের গলায় চাপা আতঙ্ক।
মার্কাস কাঁপা-কাঁপা হাতে তার ট্যাবের স্ক্রিন স্লাইড করে বলল, “চার ঘণ্টা সতেরো মিনিট পার হয়ে গেছে, স্যার। ওদের সেশন টাইম ছিল মাত্র তিরিশ মিনিটের। নির্ধারিত সময়ের পরে প্রোটোকল অনুযায়ী অটোমেটিক রিকল কোড অ্যাকটিভেট হলেও বিস্ময়করভাবে তা কাজ করেনি।”
“সিস্টেম লগ কী বলছে?”
“শুরুতে সব সিন্যাপটিক ফায়ারিং স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু হঠাৎই দুজনের ‘বিটা-ওয়েভ’ অস্বাভাবিকভাবে স্পাইক করে। সাধারণত চরম ভয়ের মুহূর্তে এমনটা হয়। তারপর থেকেই ওদের চেতনা আমাদের ট্র্যাকিং রেঞ্জের বাইরে চলে গেছে।”
“চেতনা ফিরিয়ে আনার জন্য আমরা কী কী পদক্ষেপ নিয়েছি?”
“আমাদের পক্ষে যা যা সম্ভব, সব কিছু করা হয়েছে। নিউরাল বুস্টার ব্যবহার চেতনা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু ভিতর থেকে কোনো রেসপন্সই আসছে না।” মার্কাস উত্তর দিল।
“ফিজ়িক্যালি ডিসকানেক্ট করা সম্ভব?”
“না, স্যার। চেষ্টা করলে মেয়ে দুটো চিরস্থায়ী কোমায় চলে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে।”
হ্যারিসন থমকে দাঁড়ালেন। “আমাদের কোনো টেকনিক্যাল এররের কারণে এমন হতে পারে?”
“না, স্যার,” মার্কাস ঢোঁক গিলে বলল, “আমরা আমাদের সিস্টেম চেক করেছি। সব কিছু ঠিক আছে।”
“তাহলে এমন হল কেন?”
“আমাদের বিজ্ঞানীরা এখনও উত্তর খুঁজছেন। এখন পর্যন্ত হোস্ট ব্রেনের নিউরাল ম্যাপে কিছুটা এনামলি পাওয়া গেছে। ব্রেনের অ্যামিগডালা হঠাৎ করেই অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে উঠেছে, যেটা থেকে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন কোনো কারণে ইভান গ্রোচের অবচেতন জেগে উঠে পুরো মস্তিষ্ক টেকওভার করেছে। ওর মস্তিষ্কের ভিতর চেতন-অবচেতনের একটা লড়াই চলছে।”
“আমাদের হাতে কতটা সময় আছে?”
“খুব বেশি হলে আর ঘণ্টাখানেক, স্যার। হোস্ট ব্রেনের অ্যাকটিভিটি লেভেল ৬০ শতাংশ ক্রস করে গেলে পুরো সিস্টেমটাই ক্রাশ করবে। সেক্ষেত্রে আমরা মেয়ে দুটোকেও হারাব।”
সব শুনে হ্যারিসন কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তার চেহারায় গভীর উদ্বেগের ছাপ দেখা গেল। মিডিয়া যদি খবরটা পেয়ে যায় তাহলে মেমোরি কর্প-এর শেয়ার ভ্যালু ক্রাশ ফল করবে। অপারেশন রুমে থাকা অন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
হ্যারিসন সমস্ত দিক ভেবে নিয়ে শান্তকণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, “বিকল্প আর কোনো রাস্তা নেই, মার্কাস?”
মার্কাস ভেন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনিটরের দিকে তাকাল। তারপর কাঁপা গলায় বলল, “একটা উপায় হয়তো আছে। বাইরে থেকে যখন কিছুই জানা যাচ্ছে না, তখন ভিতর থেকে চেষ্টা করতে হবে। সেজন্য জানাশোনা কেউ একজনকে ইভানের মেমোরি ওয়ার্ল্ডের ভিতরে প্রবেশ করতে হবে।”
“তাহলে আমরা সেটা করছি না কেন?”
মার্কার নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। হ্যারিসন বললেন, “বুঝতে পেরেছি। তোমরা কেউ ঝুঁকি নিতে চাইছ না!”
“ঠিক তা নয়, স্যার। আসলে ভিতরে কী চলছে, সেই ব্যাপারে কোনো তথ্যই আমাদের কাছে নেই… তাই…”
মার্কাসের কথা শেষ হতে পুরো ঘরে একটা অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এল। হ্যারিসন মাথা টিপে চেয়ারে বসে রইলেন। চেহারা দেখে মনে হল, কিছু একটা ভাবার চেষ্টা করছেন। বিড়বিড় করে কিছু একটা আওড়ালেন। তারপর একটা নাম মনে পড়তেই সচল হয়ে উঠে বসলেন।
‘ত্রিদিব বসু’—রিটায়ার্ড প্রফেসার অব সাইকোলজি। মেমোরি কর্প-এর শুরুর দিকে অ্যাডভাইজ়ার হিসেবে ছিলেন। লোকটার যেমন সাহস, তেমনি আশ্চর্য মেধা। মানবমনের ব্যাপারে তাঁর মতো জানাশোনা মানুষ হ্যারিসন আর দেখেননি।
দ্রুত মার্কাসের দিকে ফিরে হ্যারিসন বললেন, “মার্কাস, প্রফেসার ত্রিদিব বসুকে এখানে আনার ব্যবস্থা করুন। যত দ্রুত সম্ভব। এই মুহূর্তে একমাত্র উনিই হয়তো আমাদের সাহায্য করতে পারবেন।”
মার্কাস ফোনে কেউ একজনকে নির্দেশটা পৌঁছে দিল। এক মিনিটের মধ্যেই ফিরতি কল এল। অপর পাশের কথা শোনা না গেলেও মার্কাসের মুখ দেখে মনে হল, ভীষণ অবাক হয়েছেন। কথা শেষ হতেই হ্যারিসন জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে, মার্কাস?”
“স্যার, প্রফেসার ত্রিদিব বসু বর্তমানে আমাদের ওয়েটিং রুমেই বসে আছেন।”
“মানে?” হ্যারিসনের চেহারা দেখে মনে হল, তিনি ভীষণ অবাক হয়েছেন। জিজ্ঞেস করলেন, “তাঁকে খবর কে দিয়েছে?”
“আমরাই দিয়েছি। থিয়া নামের মেয়েটা, যার ভালোনাম তিয়াসা, উনি তার দাদু।”
৫
মেমোরি কর্পোরেশনের ইভান গ্রোচ মেমোরি হল। কক্ষের পাশে সারিবদ্ধভাবে রাখা মেমোরি পডের দুটোতে শুয়ে আছে থিয়া আর মিয়াকোর নিথর দেহ। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় ওরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। পডের পাশে থিয়ার নিশ্চল মুখের দিকে চেয়ে নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন প্রফেসার ত্রিদিব বসু। তাঁর চেহারায় গভীর উৎকণ্ঠার ছায়া।
মেমোরি কর্প থেকে একটা ইমার্জেন্সি ফোন পেয়ে আধ ঘণ্টা আগে এখানে এসেছিলেন। তবে এমার্জেন্সিটা কী, সেটা তখনও জানতে পারেননি। তাই ওয়েটিং রুমে চুপচাপ বসে ছিলেন। কিন্তু তারপরেই হঠাৎ পরিস্থিতি বদলে গেল। কোনো একটা নির্দেশ পেয়ে সিকিউরিটি টিম তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে এই হলঘরে নিয়ে এসেছে।
সিইও মিস্টার হ্যারিসন আগে থেকেই এখানে অপেক্ষা করছিলেন। গত পনেরো মিনিট ধরে হ্যারিসন পুরো পরিস্থিতিটা ব্রিফ করেছেন প্রফেসারের কাছে। হ্যারিসনের কথা শেষ হবার আগেই প্রফেসার বুঝে গেছেন, শেষ উপায় হিসেবে কেউ একজনকে বাইরে থেকে ভিতরে ঢুকতে হবে।
এমন পরিস্থিতিতে একজন মানুষের মনের অবস্থা যা হওয়া উচিত, প্রফেসারেরও সেটাই হয়েছে। তবে বহু বছরের অভ্যাসের বলে তিনি নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। পুরো ঘটনার মধ্যে অনেক যদি কিন্তু আছে, অনেক প্রশ্ন আছে। কিন্তু সেসব করার সময় এখন নেই! হোস্ট ব্রেনের অ্যাকটিভিটি লেভেল এখন ৫৫ শতাংশ চলছে। আর ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেই থিয়াকে চিরতরে হারাতে হবে। তাই যা করার, দ্রুত করতে হবে।
প্রফেসার শুয়ে-থাকা থিয়ার মুখের দিকে একবার তাকালেন। তারপর হ্যারিসনের দিকে ফিরে শান্ত অথচ ইস্পাতকঠিন গলায় বললেন, “আমাকে দ্রুত মেমোরি ওয়ার্ল্ডে পাঠানোর ব্যবস্থা করুন।”
হ্যারিসন কিছু বলার আগেই মার্কাস সক্রিয় হয়ে উঠলেন। থিয়ার পাশেই একটা পড প্রস্তুত করা ছিল। প্রফেসার সেটাতে শুয়ে পড়তেই কাঁপা কণ্ঠে মার্কাস ভেন জিজ্ঞাসা করলেন, “রেডি, প্রফেসার?”
“শুরু করুন।” প্রফেসারের নির্দেশ শোনা গেল।
পরক্ষণেই এক তীব্র নীল আলোর ঝলকানি, আর সেই সঙ্গে প্রফেসারের চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এল।
৬
থিয়া আর মিয়াকো নিশ্চল হয়ে বসে আছে এক গভীর অন্ধকারের মধ্যে। এমন নিশ্ছিদ্র অন্ধকার তারা জীবনে দেখেনি। এ যেন শুধু আলোর অনুপস্থিতি নয়, এই অন্ধকারের যেন প্রাণ আছে। প্রতিমুহূর্তেই অন্ধকার যেন দুজনকে চেপে ধরতে চাইছে চারদিক থেকে।
নিজেদের শ্বাসপ্রশ্বাস ছাড়া এখানে আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না। সময়েরও কোনো হিসেব নেই। কয়েক মিনিট নাকি কয়েক ঘণ্টা পার হয়ে গেছে, বোঝার কোনো উপায় নেই। শুধু মাঝে মাঝে অন্ধকারের ভেতর দিয়ে ধূসর ধোঁয়ার মতো কিছু অবয়ব ভেসে যাচ্ছে, সেগুলো যে কী হতে পারে, তা বোঝা যাচ্ছে না।
অনেকটা সময় দুজন ছুটোছুটি আর চিৎকার করে বুঝতে পেরেছি তাদের চিৎকার শোনার মতো কেউ নেই এখানে। তাই পুরো ব্যাপারটা কোনো একটা টেকনিক্যাল গ্লিচ ভেবে নিয়ে ভয়টাকে চাপা দিয়ে এতক্ষণ ধৈর্য ধরে বসে আছে ওরা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধৈর্যের বাঁধ ভাঙতে শুরু করেছে। মনের ভয় আর অনিশ্চয়তাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।
“থিয়া… মিয়াকো… তোমরা আছ এখানে?” আচমকা একটা পরিচিত কণ্ঠ শুনতে পেল থিয়া। উত্তেজনায় তার প্রতিটি স্নায়ু টানটান হয়ে উঠল। এই কণ্ঠস্বর যে তার চিরচেনা, তার পরম নির্ভরতা। সে ডুকরে কেঁদে উঠে বলল, “দাদু? আমরা এখানে।”
কাউকে দেখা গেল না। কিন্তু মনে হল, কেউ একজন এগিয়ে এল। তারপর জিজ্ঞাসা করল, “তোমরা ঠিক আছ তো?”
“হ্যাঁ, কিন্তু তুমি এখানে কীভাবে এলে?”
“তোমরা যেভাবে এসেছ, সেভাবেই। একটা মেমোরি পডে শুয়ে। আমার ব্রেন ফ্রিকোয়েন্সি তোমাদের সঙ্গে সিনক্রোনাইজ় করা হয়েছে, তাই আমি সরাসরি তোমাদের কাছে এসে পৌঁছেছি।”
“আমরা অনেক সময় ধরে এখানে আটকে আছি। উপরে কি কোনো সমস্যা হয়েছে?” মিয়াকো জানতে চাইল।
“না, ওখানে সব ঠিকই আছে। সমস্যাটা হয়েছে সম্ভবত এই মেমোরি ওয়ার্ল্ডে।”
“তুমি কীভাবে খবর পেলে যে, আমরা এখানে এসেছি?” থিয়া জিজ্ঞেস করল।
“সেটার পরে জানবে, এখন আগে আমাদের ফেরার পথ খুঁজতে হবে। সেজন্য আমার তোমাদের সাহায্য দরকার।”
“কী ধরনের সাহায্য?”
“তোমরা এখানে, মানে ইভানের মেমোরি ওয়ার্ল্ডে আসার পর থেকে ঠিক কী কী হয়েছে, সেটা আমাকে বলতে শুরু করো, দ্রুত।”
“ঠিক আছে…”
একটু গুছিয়ে নিয়ে থিয়া বলতে শুরু করল। ভ্যালি অব ফেদারস, মিউজ়িক ট্রি, ইভানের স্টুডিয়ো কিছুই বাদ গেল না। সব শেষে লস্ট পেইন্টিং-এর কথাটা শুনেই প্রফেসারের মনে হল, যেটা খুঁজছিলেন, সেটা পেয়ে গেছেন।
তার ধারণা যদি সত্যি হয় তাহলে এই লস্ট পেইন্টিংটাই যত নষ্টের গোড়া।
৭
মেমোরি কর্প-এর ল্যাবে উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে উঠেছে। হ্যারিসন, মার্কাস থেকে শুরু করে উপস্থিত সকলে মিলে রুদ্ধশ্বাস আতঙ্কে তাকিয়ে আছেন দেয়ালের হলোগ্রাফিক ডিসপ্লেটার দিকে। যেটা দেখাচ্ছে, ইভানের মেমোরি অ্যাকটিভিটি এই মুহূর্তে ৫৯ শতাংশে পৌঁছে গেছে।
“মে গড ব্লেস আস অল।” মার্কাস ফিশফিশ করে প্রার্থনা করলেন।
ওদিকে মেমোরি ওয়ার্ল্ডের গভীরে অন্ধকারের ভিতর একটি দীর্ঘ নীরবতার পর আবার প্রফেসারের কণ্ঠ শোনা গেল। কণ্ঠে মৃদু উত্তেজনার আভাস।
“থিয়া, মিয়াকো, মনে হচ্ছে, আমি সমস্যার ট্রিগার পয়েন্টটা ধরতে পেরেছি।”
“কী সেটা?”
“ওই লস্ট পেইন্টিং। আমার ধারণা, বাস্তব দুনিয়ায় ছবিটা নিয়ে এমন কিছু একটা হয়েছিল, যেটার ছাপ পড়েছিল ইভানের অবচেতনে। ছবিটার কথা ভুলে যেতে চেয়েছিলেন ইভান। তাই সেই স্মৃতিটা চাপা পড়েছিল। কিন্তু আজ যখন তোমরা আবার সেই স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলেছ, তখনই অবচেতন সক্রিয় হয়ে তোমাদের বন্দি করেছে। এই ধারণাটা যদি সত্যি হয় তাহলে হয়তো মুক্তির একটাই পথ আছে…”
“সেটা কী, দাদু?” চাপা গলায় জিজ্ঞেস করে থিয়া।
“তোমাদের ওই ছবিটার কথা ভুলে যেতে হবে। চিরতরে।” কঠিন গলায় বললেন প্রফেসার।
“ভুলে যাব? কিন্তু কীভাবে?” থিয়া আর মিয়াকো যুগপৎ অবাক হয়ে প্রশ্ন করল।
“এমনি হয়তো সেটা সম্ভব নয়। কিন্তু আমি তোমাদের সাহায্য করতে পারি, নিউরাল ব্লকিং-এর মাধ্যমে। এটা এক ধরনের হিপ্নোটিক প্রসেস, যার মাধ্যমে ট্রমাটিক পেশেন্টদের মস্তিষ্ক থেকে যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতি মুছে ফেলা যায়। কিন্তু সেজন্য তোমাদের দুজনকেই আমার উপর বিশ্বাস করতে হবে।”
“আমরা রাজি, দাদু। কী করতে হবে?”
“তোমাদের কিছুই করতে হবে না। শুধু চোখ খোলা রেখে অন্ধকারের গভীরে তাকিয়ে থাকো আর আমি যা যা বলব, সেইমতো বলতে থাকো। তোমরা তৈরি তো?”
মেয়ে দুটো সায় দিল। প্রফেসার তাঁর হিপ্নোটিক প্রসেস শুরু করলেন, “থিয়া… মিয়াকো… আমার কথা কি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছ?”
“পাচ্ছি… দাদু।”
“আমি এখন একশো থেকে উলটোদিকে গুনতে শুরু করব। প্রতিটি সংখ্যার সঙ্গে তোমরা ইভানের সেই পুরোনো স্টুডিয়োতে ফিরে যাবে। প্রতিটি স্নায়ু দিয়ে অনুভব করো সেই রঙের গন্ধ, সেই কাঠের মেঝে… গণনা শেষ হতেই তোমরা নিজেদের কে আবিষ্কার করবে দ্য লস্ট পেইন্টিং-এর সামনে। এখন শুরু করো…”
প্রফেসার স্থির লয়ে উলটো গণনা শুরু করলেন, “একশো… নিরানব্বই… আটানব্বই… সাতানব্বই…”
গুনতে গুনতে থিয়ার মনে হল, দাদুর কণ্ঠটা যেন অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে। প্রতিবার গোনার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের ঘন অন্ধকারের সেই দেয়ালগুলো যেন ধীরে ধীরে স্বচ্ছ হয়ে আসছে। এভাবে কতক্ষণ চলেছিল মনে নেই, কিন্তু একসময় গণনা শেষ হতেই থিয়া দেখল, সে আবার সেই পুরাতন স্টুডিয়ো ঘরে দাঁড়িয়ে আছে।
“তোমরা এখন কোথায় আছ?” অনেক দূর থেকে প্রফেসারের কণ্ঠ ভেসে এল।
“ইভানের স্টুডিয়োতে…”
“ইজেলের উপর ক্যানভাসটা দেখতে পাচ্ছ?”
“হ্যাঁ, দেখতে পাচ্ছি।”
“সেখানে কী আছে?”
“একটা ছবি… অদ্ভুত সুন্দর আর বিষণ্ণ ছবিটা…” থিয়ার কণ্ঠে ঘোর।
“এবার মন দিয়ে শোনো। আমি চাই, তোমরা দুজন এই ছবিটার কথা ভুলে যাবে। সেই সঙ্গে ভুলে যাবে এই অন্ধকার অবচেতনের কথাও। আমরা এখন এক থেকে গণনা শুরু করব। প্রতিটি সংখ্যার সঙ্গে সঙ্গে তোমাদের মস্তিষ্কে থাকা ছবির সকল স্মৃতি মুছে যাবে। ছবিটা পরিণত হবে কেবলই এক সাদা ক্যানভাসে। কোনো রেখা থাকবে না, কোনো রং থাকবে না। গুনতে থাকো আমার সঙ্গে… এক… দুই… তিন…”
“এক… দুই… তিন…”
গণনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে থিয়া আর মিয়াকোর চোখের সামনে ছবিটা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে জলরঙের মতো ধুয়ে যেতে শুরু করল। থিয়ার মনে হল, এক অদ্ভুত শিথিলতা তার শরীরকে গ্রাস করছে। চোখের পাতাগুলো পাথরের মতো ভারী হয়ে আসছে। এত ভারী যে চোখ খুলেও রাখা যাচ্ছে না।
পরিশিষ্ট
থিয়া যখন চোখ মেলল, তার মনে হল, সে কোনো তরল রঙের সমুদ্রে ডুবে আছে। কিন্তু পরক্ষণেই সে বুঝল, সে দাঁড়িয়ে আছে এক আদিগন্ত বিস্তৃত উপত্যকায়, যেখানে আকাশটা ঠিক আকাশের মতো নয়; বরং কোনো এক শিল্পীর ক্যানভাসে ঢেলে-দেওয়া উজ্জ্বল বেগুনি আর ফিরোজা জলরঙের মিশেল।
“অদ্ভুত… অবিশ্বাস্য!”
কথাটা কানে যেতেই ঘুরে তাকিয়ে থিয়া দেখল, তার পাশে মিয়াকো দাঁড়িয়ে আছে। আর মিয়াকোর পাশে ওটা কে? আরে, ওটা যে দাদু।
থিয়া অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “দাদু, তুমি এখানে? কীভাবে?”
প্রফেসার ত্রিদিব বসু কোনো উত্তর দিলেন না। বদলে একটা প্রশান্ত হাসিতে তার মুখটা উদ্ভাসিত হল।
আর ঠিক সেই সময়ে মেমোরি কর্প-এর ল্যাবে মনিটরের সামনে দাঁড়িয়ে-থাকা সবাই আনন্দে দু-হাত উপরে তুলে চিৎকার করে উঠল। মেয়ে দুটোর ব্রেন সিগন্যাল ফিরে এসেছে আর সেই সঙ্গে ইভানের ব্রেন অ্যাকটিভিটি মনিটরের রিডিংও উলটো গণনা শুরু করেছে।
Tags: একাদশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা, শিমুল মন্ডল
