খ-অখ-নখ্
লেখক: সোঘো
শিল্পী:
“আমরা খ। খ-এ আমাদের বাস…”
“উঁহুঁ উঁহুঁ, পালক, তা কী করে হয়, খ-এ তো আর আমরা বাস করি না, বাস তো করি রাশেভের পাথরে, মাটিতে।”
“বললেই হল, তুমি যে গতকাল নরথ ডোবা অবধি খ-তেই চরে বেড়াচ্ছিলে, তার বেলা?”
“আহা, সে তো আমি বাচ্চাগুলোকে প্র্যাকটিস করাচ্ছিলাম, আজ বাদে কাল খ-এলা, দেশ-বিদেশ থেকে খ আসবে, কত বড়ো বড়ো অখ আসবে…”
“হ, আসবে, আর এদের বুঝি আপ্যায়ন করতে হবে না, প্রত্যেক খ-এলার মতো শুরুর ভাষণ দিতে হবে না বুঝি?”
“তা তো হবেই, তা তো হবেই, তা ছাড়া এবারই তোমার শেষ ভাষণ, পরের বার তো পালক আর চ মিলে দেবে ভাষণ।”
এইবেলা পালাতে হবে। ভাষণ দিতে আমার জঘন্য লাগে। মা-র ভাষণ দিতে দারুণ লাগে, কিন্তু কিছু করার নেই, পরের বার মা দিতে পারবে না। বাবা সেটা এতদিনে এতবার মনে করিয়েছে যে, মাথার ঘিলু থেকে মুখের চঞ্চু অবধি সেই স্বাদে রি-রি করছে। সুড়ুত করে পাথরবাটির পেছনের গর্ত দিয়ে বেরিয়ে আকাশনীল খ-এ নিজেকে এলিয়ে দিলাম, নতুন মধুমাছির মোম-লাগানো পাখাগুলো মাখনের মতো খুলল, গরম উপরহাওয়া ধরল, আঃ-রাঃম!
“এই যা, চ-মাঞ্চু, পালাচ্চ কোতা? ধরেছি!”
খেয়েছে, দিদি! তক্কেতক্কে ছিল নির্ঘাত, ধরেছে কপাত করে।
ধরেছে?
চ-কে ধরা সহজ নয়, বাগে পাওয়া তো আরও সহজ নয়। নিমেষে পাখা দুটো শরীরের সঙ্গে সেঁটে ঘূর্ণি ডাইভ দিলাম। পুরব-নীল আকাশে কতক পেঁজা পেঁজা বেগুনি-সাদা মেঘ ছিল, ঘূর্ণির বেগে তারাও যেন বনবন করে ঘুরতে লাগল। গত খ-এলাতে জুনিয়র বিভাগে এই কাণ্ড করেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম, চো সেদিন আমার একটা পালকও ছুঁতে পারেনি।
দুঃখের বিষয়, দিদি সিনিয়র বিভাগের চ্যাম্পিয়ন। দ্বিগুণ গতিতে ডাইভ দিয়ে সে আমায় পিছনে ফেলে দিল। কীভাবে দিল, জানি না, কিন্তু এই না হলে সিনিয়র চ্যাম্পিয়ন? হার স্বীকার করলুম।
“সে কী, জু-চ্যাম্প? এত সহজে হেরে গেলে চলবে?” খিলখিল করে হেসে বলল পালক। গতবার খ-এলার ঠিক আগে দিদির নামদিন গেল, মা নিজের হাতে তার ভুরু-কপালে সবুজ এঁকে বলেছিল, “আজ, এই নরথ আর পুরবের সন্ধিস্থলে, মহান খ-কে সাক্ষী মেনে, তোমায় দিলাম আমি নিজের নাম। রাশেভের সমস্ত খ ও অখ তোমায় আজ থেকে আমার নামে চিনবে, পালক।”
বাবা পরে ফিশফিশ করে মা-কে বলেছিল, ভাষণটা যথেষ্ট জম্পেশ হয়নি। মা তাতে রেগেমেগে খ-এলার ভাষণ আরও সওয়া দু-মিনিট বাড়িয়ে দিয়েছিল।
মা-র নাম নিয়ে দিদি গতবার খ-এলা চ্যাম্প হয়েছিল। আমিও চাই, বাবার নাম নিয়ে এবার আমি চ্যাম্প হব। জুনিয়র চ্যাম্পদের সবাই জু-চ্যাম্প বলে, সিনিয়রদের চ্যাম্প বলে। জু-চ্যাম্প হয়ে বন্ধুদের কাছে কারদানি মারা যায়, মেয়েদের কাছে ব্যাপারটা বেশি দিন ধোপে টেকে না। আমার স্বপ্ন, দিদির মতো চ্যাম্প হব, সি-চ্যাম্প, আর দারুণ একটা বিয়ে করব। আর প্রচুর পোকাপাই খাব।
“প্র্যাকটিস কেমন চলছে, চ-মাঞ্চু?” অর্ণবমধ্যে ক্ষুদ্র দ্বীপটায় নেমে জিজ্ঞেস করল দিদি। ক্ষুদ্র দ্বীপটা প্রায় পুরোটাই এবড়োখেবড়ো কালচে পাথর, এদিক-ওদিক গর্তে অর্ণবজল জমে আছে, তাতে রংবেরঙের মাছ খেলা করছে। আকাশে এখন শুধুই পুরব, তাই সবুজ-লাল মাছেরাই বেশি, পরে পুরব ঘুমিয়ে নরথ জাগলে নীল-কালোরা বেরোবে। মাছের খেলা দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। পালিয়ে আসতে গিয়ে মাছের নোটবইটা নেহাত ঘরে ফেলে এসেছি, নয়তো নোট নিতাম। সব মিলিয়ে ২৭টা গর্ত, তাতে অন্তত ২১৭খানা—
“এই চ-মাঞ্চু!” দিদির চ্যাঁচানিতে ঘোর কেটে গেল। “মাছ দেখলেই ভাইয়ের আর মাথার ঠিক থাকে না, গোনাগুনতি করাই চাই। আচ্ছা, মাছ গুনে তোর কী হবে? তোর হবু বউয়ের জন্য মাছ-বাক্সো করবি?” ফিক করে হেসে দিদি বলল।
“না গো, মাছ-বাক্সো নয় গো,” উৎসাহ পেয়ে আমি শুরু করলাম, “স্বাদ। বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন রং বিভাগের মাছ বিশেষভাবে মিশিয়ে অদ্ভুত কিছু স্বাদ তৈরি হয়। খ-এলাতে দৈত্য অখ আসছে পাথরজলদেশ থেকে, বলেছে, সঙ্গে অনেক পাথরজল আনবে, তার সঙ্গে বাবার পেটেন্ট-নেওয়া পায়েসক্রিম মিশিয়ে একটা নতুন জিনিস আবিষ্কার করব বলে ঠিক করেছি।” একনিশ্বাসে বলে গেলাম আমি।
অন্যরা আমার এইসব কথা শুনে হাসে, বা আগ্রহ হারিয়ে উড়ে চলে যায়। দিদি কিন্তু সব সময় মন দিয়ে কথাগুলো শোনে। কত বোকা-বোকা অদ্ভুত অদ্ভুত মাথামুণ্ডুহীন আইডিয়া বেরিয়েছে আমার মাথা থেকে—দিদি কিন্তু সব ক-টা মন দিয়ে শুনেছে, তারপর নিজের বক্তব্য পেশ করেছে। যেমন আজ শুনে-টুনে বলল, “ইনটারেস্টিং! নাম কী দিবি, ঠিক করেছিস?”
“জিনিসটা দাঁড়াক আগে।”
“ধুর বোকা,” আমার মাথার পালকগুলো ঘেঁটে দিয়ে হেসে বলে দিদি, “নামেই তো অর্ধেক জিত। দাঁড়া, বাবার রেসিপির নাম পায়েসক্রিম, তা-ই তো? দৈত্য অখ, মানে গোলায়েথরা পাথরজলকে তাদের ভাষায় ‘আইস’ বলে ডাকে—এই তো, হয়ে গেল। নতুন খাবারটার নামে দে ‘আইসক্রিম’।”
আইসক্রিম! দারুণ নাম তো! লাফিয়ে দিদিকে জড়িয়ে ধরলাম, দিদিও হেসে কুটোপুটি, কী মজা!
হাসতে হাসতে দুজনে উড়ে গিয়ে বসলাম চুনিদার দোকানে।
চুনিদার বড়ো নাম অলপ্প্রাস গ্রো-কাশ। চুনিদা খ নয়, অখ। সবুজ বড়ো অখ। দিদির ভাষায়, অর্ক্। বিশাল মুলোর মতো দাঁত, চুনিলাল চোখ, পান্নাসবুজ গায়ে একরত্তি পালক নেই, ডানার কথা তো ছেড়েই দিলাম। (খ ছাড়া ডানা কারও থাকতেই পারে না।) চোখের রঙের জন্যই দাদু নাম রেখেছিলেন চুনি। চুনিদা খ-দেশেই বড়ো হয়েছে। পাথর ঘষে রং বের করা চুনিদার চেয়ে ভালো কেউ পারে না, সবরঙা রঙের আলপনা আঁকতেও চুনিদার জুড়ি মেলা ভার। খ-এলা আসছে, সাজুগুজু করতে হবে, চুনিদার কাছে যাওয়া একেবারে মাস্ট!
“আরে! চ্যাম্প! আর জু-চ্যাম্প! কী সৌভাগ্য, এসো এসো, বোসো বোসো।” বলতে বলতে চুনিদা দুটো পাথরটুল বের করে দিলেন। উনুনে গরম চা ছিল, সবাই এক বাটি করে চা নিয়ে গুছিয়ে বসলাম।
“তো, পালকদিদিমণি, এবারের প্রস্তুতি কদ্দূর?” চুনিদা জিজ্ঞেস করলেন।
“আমার তো আর এবার খেলা নেই, চুনিদা,” চায়ে চুমুক দিয়ে দিদি বলল, “খেলা তো ভাইয়ের। আমাদের নাচ ও গান। প্রস্তুতি ভালোই চলছে। আমাদের কোচ মাসিমণি, অতএব গোলমাল হবার ভয় নেই।”
“ও বাবা, মণিপ্রবীণ!” ভুরু তুলে হেসে বলল চুনিদা, “মণির মতো কোচ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।”
“নির্ঘাত মা মাসিমণিকে রাজি করিয়েছে।”
“পালক-মায়ের তো এবারই শেষ, তা-ই না?”
“হ্যাঁ গো, পরের বার বোধহয় আমাকেই দায়িত্ব নিতে হবে, তাই মা একটু বেশিই টেনশন করছে।”
“আরে ধুর,” চায়ের শেষ কিছু ফোঁটা অর্ণবজলে বিসর্জন দিয়ে বরুণজলে বাটিটা ধুয়ে বলল চুনিদা, “তুমি দারুণ করবে। তোমার মা-ও পরের বার ঠিকই থাকবে, ওসব রাশেভের নিয়ম পালক-মায়ের ক্ষেত্রে ফুস্স।”
চা শেষ, চা বিসর্জন দিয়ে বাটি ধুয়ে চুনিদার হাতে দিলাম। বাটি মুছে রেখে চুনিদা বলল, “রঙের জন্য এসেছে, খ-এলা তো আর দুই পুরব, সাজতে হবে, তা-ই তো?”
দিদি আমাকে ঠেলা মেরে বলল, “আমার চ-মাঞ্চু ভাইটা চ্যাম্প হতে চায়, সি-চ্যাম্প। কেন বল দেখি চুনিদা!”
“এই না না, এসব আবার কেন?” আমি হাঁইমাই করে উঠলাম। দিদি ভ্রূক্ষেপ না করে বলেই চলল, “কারণ, সি-চ্যাম্প হয়ে ভাই চূর্ণিমালাকে বে করবে।”
চুনিদা হোহো করে হেসে উঠল, “আরে চ-ভাই, এ তো খুব ভালো কথা। চূর্ণির নামদিন তো এই সবে হল, আমি গিছলাম তো, কী ভালো হল। খুব মানাবে দুজনকে। তো, চ-ভাই, তোমার নামদিন তো কালপুরবে, কী নাম নেবে, ঠিক করলে?”
দিদির হাত থেকে কোনোমতে মুক্তি পেয়ে নিজেকে ঠিকঠাক করে ঘাড় সোজা করে বুক চিতিয়ে বললুম, “বাবা যদি তার নামটা দেয়, তাহলে জু-চ্যাম্প চ-এর জীবন খ-সার্থক হবে।”
মাথাটা দুবার উপরনীচ দুলিয়ে চুনিদা বলল, “আরেকজন চঞ্চু! হোক! মঁচোশ্বাষ্টর নামে দিব্যি কেটে বলছি, তোমার মনোবাঞ্ছা যেন পূর্ণ হয়। এইবার, পালকদিদিমণি, চ-ভাই, তোমরা রং পছন্দ করো, আমার কিছু বন্ধু আসছেন, দেখতে পাচ্ছি, তাদের সঙ্গে কথা বলে আসছি।”
দিদি তক্ষুনি রং মেশাতে বসে গেল। আমি তাকিয়ে দেখলাম, অর্ণবযানে চেপে তিনজন অখ এসে নামলেন চুনিদার পাথরদ্বীপে, চুনিদা তাদের অভ্যর্থনা জানিয়ে দোকানে এসে বসালেন। প্রথমজন চুনিদার বন্ধু ও গোষ্ঠীভাই গ্রমাশ ব্রো-গার্গ, খুব ভালো তিনতারা বাজাতে পারেন, গত খ-এলাতে বাজিয়েছেন, আমার খুব প্রিয় অখ। সঙ্গে এক বিশাল দাড়িওয়ালা ছোটো লোহা অখ, দিদির ভাষায় ডোয়ার্ফ, চুনিদার আরেক ভালো বন্ধু ব্র্যুন ব্রঞ্জবিয়ার্ড। পাথর কেটে অপরূপ সব চিত্র সৃষ্টি করেন রূপদক্ষ ব্র্যুন। গত খ-এলায় এঁর প্রদর্শনী ছিল, ঘণ্টার পর ঘণ্টার আমরা এঁর কারুকার্যের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে ছিলাম।
তৃতীয় ব্যক্তিকে চিনলাম না। ইনি সরুকান চিরকাল অখ, এল্ফ। গত খ-এলাতে একজন সরুকান অখ এসেছিলেন, চুপচাপ বসে ছিলেন সারাক্ষণ, তারপর পাঁচ মিনিট ধরে ভাষণ দিয়েছিলেন। দিদি বুঝিয়েছিল উনি এই প্রদেশের গবন্ন, সর্বেসর্বা কর্তা ইত্যাদি। ব্যাপারটা কী তখন বুঝিনি, কিন্তু সরুকানরা যে বেশ ক্লান্তিকর হয়, সেটা বুঝেছিলাম। অথচ চুনিদার সামনে বসা সরুকানকে দেখে একদমই ক্লান্তিকর বলে মনে হচ্ছিল না। চারজনে মিলে চা সহযোগে বেশ সুন্দর জমিয়ে আড্ডা শুরু করেছিলেন। দিদির একমনে রং মেশাচ্ছিল, আমি একটু এদিকে সরে এসে কান পাতলাম। খুব কাছে গেলুম না, পাছে ওঁরা ভাবেন, ওদের কথা শুনছি। অন্য খ-দের তুলনায় শ্রবণশক্তি আমার একটু বেশিই, অতএব অসুবিধে হওয়ার কথা নয়।
চুনিদা বলছিল, “ব্র্যুন, ভায়া, এবারের খ-এলাতে নতুন কিছু স্টোনার্ট পাচ্ছি তো?”
দাড়ি থেকে চা মুছে ব্র্যুন বললেন, “পাচ্ছ তো বটেই, সঙ্গেই এনেছি, বোটেই আছে, মসক্লথ দিয়ে মোড়া আছে।”
“আমি কিন্তু ব্র্যুনের নতুন স্টোনার্ট দেখতেই এতদূর এলাম।” স্মিত হেসে বললেন সরুকান।
“লজ্জা দেবেন না মহামান্য ঝেস্যেইল,” হোহো করে হেসে বললেন ব্র্যুন, “আমার স্টোনার্ট দেখতে আপনি সুদূর পান্নাদ্বীপ থেকে এতদূর এলেন, বিশ্বাস হতে মন চাইলেও দিমাগ মানে না।”
“কেন?” হেসেই বললেন ঝেস্যেইল, “আর্ট কি ভালো লাগতে নেই?”
“অবশ্যই, বন্ধু সিলভারফ্রন্ড, অবশ্যই,” চায়ের বাটিটা নামিয়ে বললেন গ্রমাশ, “কিন্তু তুমি হলে গিয়ে পান্নাদ্বীপের বিখ্যাত জাদুনিয়ন্ত্রণ সংস্থা অনিক্স কাউন্সিলের বিশিষ্ট সভ্য, তুমি এখানে এতদূরে মানে কুছ তো গড়বড়, কী বলো, অলপ্স?”
“হককথা গ্রমস, হককথা।” মিচকি হেসে বলল চুনিদা, “মহামান্য ঝেস্যেইল সিলভারফ্রন্ড প্রথমবার এই গরিবের দোকানে এসেছেন, আমার চা খেয়ে আমায় গর্বিত করেছেন, এবারে ঝেড়ে কাশুন তো মশাই, ব্যাপারটা কী?”
“ভিনগ্রহীরা জটলা পাকাচ্ছে ফের।” গলা নামিয়ে বললেন সরুকান।
চুনিদা চমকে উঠল। গ্রমাশ ও ব্র্যুন উদ্বিগ্ন হয়ে বন্ধুর দিকে তাকালেন। সরুকান সন্ত্রস্ত হয়ে বললেন, “ভুল কিছু বলে ফেললুম মহামান্য অলপ্প্রাস? ক্ষমা করবেন।”
“ভুল কিছু বলোনি সিলভারফ্রন্ড,” গ্রমাশ বললেন, “অল্পস ছোটোবেলায় খুনে ভিনগ্রহীদের হাতে নিজের মা-বাবাকে হারায়। অল্পসের মা উর্জুল গ্রো-কাশ ছিলেন খুব বড়ো আর্কিয়োম্যাজিলজিস্ট, উনি মেটাম্যাজিক নিয়ে চর্চা করতেন।”
“মেটাম্যাজিক!” শিউরে উঠলেন ব্র্যুন, “মুরাদিনের দিব্যি, উর্জুল এই ঘৃণ্য জঘন্য জিনিসটা নিয়ে গবেষণা করতেন? কেন?”
“রাশেভকে এখন যেমন শান্তিপূর্ণ দেখছেন মহামান্য ব্র্যুন,” সরু পাইপে অগ্নিসংযোগ করে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন ঝেস্যেইল, “চিরকাল এরকম ছিল না। জানেনই তো, অসীম অকালের নবম প্রবেশদ্বার পেরিয়ে রাশেভে প্রথম আসি আমরা তিন প্রাচীন গোষ্ঠী—ডোয়ার্ফ, অর্ক্ ও এল্ফ। অসীম অকাল কী, নবম প্রবেশদ্বারই-বা কী, ইতিহাসের পাতা থেকে সে তথ্য লুপ্ত। রাশেভে আমরা আসার পর কী হয়, তা কিছু জানা যায় বই-কি। বেশ কিছু শতাব্দী আমরা তিন গোষ্ঠী এখানে নিজেদের জায়গা করে নিই, রাশেভের আদি বাসিন্দা আরাকোক্রাদের সঙ্গে আমরা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গঠন করি। তারপর গোলমাল বাধে। অসীম অকালের নবম প্রবেশদ্বার ফের উন্মুক্ত হয়, একের পর এক উপস্থিত হয় গোলায়েথ, গবলিন ও বাহামুটের উপাসক ড্রাগনজাত গোষ্ঠী। মনোমালিন্য, কথা-কাটাকাটি, মারামারি থেকে পুরোদমে যুদ্ধ। এরই মধ্যে এসে পড়তে থাকে নোম, কেঙ্কু, গেনাসি ও টিয়ামাতের উপাসক টিফ্লিং গোষ্ঠী। বলাই বাহুল্য, পরিস্থিতি বেশ ঘোরালো হয়ে ওঠে। বাহামুট ও টিয়ামাত ড্রাগনজাত ও টিফ্লিংদের ঘৃণ্য মেটাম্যাজিক শেখায়। আরাকোক্রা শামানেরা তখন এক মহান জাদু রিচুয়াল রচনা করেন। তিন মাস ধরে চলে এই রিচুয়াল, সেটা আটকাতে বহুবার ড্রাগনজাত ও টিফ্লিংরা এই আর্কিপেলাগোদেশ আক্রমণ করে, হাজার হাজার অর্ক্, এল্ফ, ডোয়ার্ফ ও আরাকোক্রা প্রাণবলি দেন। রিচুয়াল শেষে আরাকোক্রা শামানরা নিজেদের প্রাণ বিসর্জন দিয়ে মেটাম্যাজিকের গুপ্তরহস্য পাথর-খাঁচায় বন্দি করেন, বাহামুট ও টিয়ামাতও তাদের সাঙ্গোপাঙ্গসুদ্ধু রাশেভ থেকে সুদূর শালাতে নির্বাসিত হন। যুদ্ধ শেষ হয়। ট্রিলোবাইট চুক্তি লিখিত হয়, খুব শক্তিশালী জাদুর উপর নিষেধাজ্ঞা বসে এবং এহেন বিষয়ে তিন প্রাচীন গোষ্ঠীর নির্দেশই যে মান্যতা পাবে, সে কথাও চুক্তিতে লিখিত থাকে। সবাই চুক্তি মেনে নেয়, রাশেভে পুনরায় শান্তি ফিরে আসে। সাড়ে আটশো বছর ধরে মোটের উপর সে শান্তি বজায় থাকে। বছর পঞ্চাশ আগে অসীম অকালের নবম প্রবেশদ্বার ফের খুলে যায়, রাশেভে আবির্ভূত হয় নতুন ভিনগ্রহীরা। এরা শামান, জাদুকর, ড্রুইড নয়, এরা সর্সারার। জাদু এদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে উপস্থিত, জাদু এদের বন্ধু নয়, সহযোগী নয়, জাদু যেন এদের কাছে বন্য জন্তু, শিকারের বস্তু, শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার বস্তু। এদের আসায় রাশেভের শান্তির আবহ বিঘ্নিত হয়। এরা ট্রিলোবাইট চুক্তি মানে, যেখানে মন চায়, উপনিবেশ স্থাপন করে, স্থানীয়রা প্রতিবাদ জানাতে এলে জাদু দিয়ে তাদের শায়েস্তা করে। এদের মধ্যে বেশি শক্তিশালী কিছু সর্সারার নিজেদের ওয়ারলর্ড ঘোষণা করে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে থাকে।”
ব্র্যুন নিজের পাথরের পাইপ ধরিয়ে বললেন, “জানি। ভিনগ্রহীরা খুব কম সময়ের মধ্যে ফুলেফেঁপে উঠেছিল। তিন প্রাচীন গোষ্ঠী মিলে তাদেরকে আটকাবার মতো বাহিনী তৈরি হয়, সেই বাহিনীতে আমি ছিলাম। ট্রিলোবাইট চুক্তি মেনে শক্তিশালী জাদুবিরোধী আর্টিফ্যাক্ট ব্যবহার করে ভিনগ্রহীদের শায়েস্তা করি, ওরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে।”
“ঠিক তা-ই,” বললেন ঝেস্যেইল, “মনে করা গিছল, ভিনগ্রহীরা হয়তো ধীরে ধীরে রাশেভিয় শান্তিপ্রিয় জীবনে অভ্যস্ত হয়ে যাবে। কিছু ভিনগ্রহী হলও তা-ই, কিন্তু সর্সারার ওয়ারলর্ডরা হার স্বীকার করল না। তারা খুঁজতে লাগল মেটাম্যাজিকের গুপ্তরহস্য। মেটাম্যাজিকের সামনে আমাদের জাদুবিরোধী আর্টিফ্যাক্ট শক্তিহীন। অতএব তা যেন কোনোমতেই তাদের হাতে না পড়ে, তাই অনিক্স কাউন্সিল উর্জুলের কাছে অনুরোধ করে, তিনি যেন ভিনগ্রহীদের আগেই মেটাম্যাজিকের রহস্য খুঁজে বের করেন।”
“কেন?” এতক্ষণ চুপচাপ ছিল চুনিদা।
ঝেস্যেইল জবাব দিলেন, “ট্রিলোবাইট চুক্তি অনুসারে গত প্রায় আট-ন-শতাব্দী ধরে মেটাম্যাজিকের গুপ্তরহস্য খুঁজে বের করার চেষ্টা কেউ করেনি। সুবিধা অবশ্য হত না, রাশেভের জাদু দিয়ে মেটাম্যাজিক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। হয় বাহামুট-টিয়ামাতের মতো ড্রাগনদেবতা লাগবে, নয় লাগবে সর্সারি জাদু। রাশেভের বাসিন্দাদের পক্ষে সর্সারি সম্ভব নয়, কিন্তু ভিনগ্রহীদের সে অসুবিধে নেই। অতএব মেটাম্যাজিকের রহস্য কোথায় লুকিয়ে আছে, সেটা জানা একান্ত প্রয়োজন ছিল, যাতে সেই গুপ্তরহস্য আরও ভালোভাবে সুরক্ষিত রাখা যায়। অনিক্স কাউন্সিলের প্রস্তাবে উর্জুল রাজি হন। বছর দশেকের অক্লান্ত পরিশ্রম ও গবেষণার ফলস্বরূপ জানা যায়, আণব দেশের লুপোডারের পার্শ্ববর্তী গুহাঞ্চলের পাথরের মধ্যে বন্দি রয়েছে মেটাম্যাজিকের রহস্য। দুঃখের বিষয়, এই খবর এক বিশেষ ভিনগ্রহী ওয়ারলর্ড জানতে পেরে যায়। স্যানসিলিয়াস ফায়ারফ্রেন্ড ও তার দুই সাথি উর্জুল ও পরিবারকে ধাওয়া করে।”
“বাকিটা আমি বলছি।” পাইপের পোড়া তামাক অর্ণবজলে বিসর্জন দিয়ে বসে বলেন গ্রমাশ, “উর্জুল গ্রো-কাশ আমাদের বন্ধুর অলপ্প্রাসের মা, আগেই বলেছি। এই ঘটনা ঘটছে প্রায় ছত্রিশ বছর আগে, অল্পস তখন খুবই ছোটো। অল্পসের বাবা আব্জুক গ্রু-উথক নামকরা ভেষজ বিজ্ঞানী, জেডাইট উপবন কলেজে হার্বোলজির বিভাগীয় প্রধান, অল্পস তাঁর কাছেই বড়ো হচ্ছিল। বিপদের কথা জানতে পারে তিনি ছেলেকে নিয়ে উর্জুলের সঙ্গে যোগদান করেন, তারপর শুরু হয়ে তাঁদের পলায়ন জীবন। অল্পসকে নিয়ে পালিয়ে বেড়ানো অবাস্তব, তাই তাঁরা এই আর্কিপেলাগোদেশে আসেন, প্রবীণ আরাকোক্রা চঞ্চুর হাতে অল্পসকে সঁপে ভিনগ্রহীদের ভুল পথে চালিত করতে চেষ্টা করেন। নির্ঘাত সফল হন, কেন-না ভিনগ্রহীরা আর্কিপেলাগোদেশের খোঁজ পায়নি, আরাকোক্রা অল্পস সবাই শান্তিতে জীবন কাটিয়েছে। উর্জুল আর আব্জুকের কী হল, আর জানা যায়নি। আশা করি, অনিক্স কাউন্সিল নিশ্চয়ই তাঁদের লুকিয়ে রেখেছেন। স্যানসিলিয়াস ও তার সাথিরা একদিন না একদিন ধরা পড়বেই। আশা করি, সেদিন তাঁরা অজ্ঞাতবাস থেকে বেরিয়ে আসবেন, অল্পসের সঙ্গে পুনরায় তাঁরা মিলিত হবেন।”
সরুকান ঝেস্যেইল চুনিদার দিকে অশেষ দুঃখের সঙ্গে তাকালেন, “আমায় ক্ষমা করবেন, বন্ধু গ্রো-কাশ, কুবার্তা বয়ে এনেছি আমি। উর্জুল গ্রো-কাশ ও তাঁর স্বামী আব্জুক গ্রু-উথক ছদ্মবেশে অনিক্স কাউন্সিলের নিরাপদ আশ্রয়ে ছিলেন অনেক বছর। স্যানসিলিয়াস যে কত ধূর্ত, কত নাছোড়, কত জিদ্দি পিশাচ, সেটা আমরা বুঝতে পারিনি। অনিক্স কাউন্সিলে তাঁর চর ছিল, সে বিশ্বাসঘাতক অনেক চেষ্টায় নিরাপদ আশ্রয়ের ঠিকানা জোগাড় করে স্যানসিলিয়াসকে জানায়। পত্রপাঠ স্যানসিলিয়াস সেই পবিত্র আশ্রম আক্রমণ করে, ভয়ংকর অগ্নিস্ফোরণ জাদুমন্ত্র প্রয়োগ করে আশ্রয়স্থল ধ্বংস করে, অনিক্স কাউন্সিলের রক্ষীদের নিজের হাতে খুন করে। উর্জুল মহীয়সী অর্ক্, কঠিন জেরার মুখেও মেটাম্যাজিকের রহস্য তিনি ফাঁস করেননি, তাই শেষে রেগেমেগে স্যানসিলিয়াস নিজহাতে উর্জুল ও আব্জুককে…”
ঝেস্যেইল চুপ করলেন, কারণ চুনিদার চোখে জল। বাকিটা আমিও বুঝে নিলাম, বলতে হল না। “ভিনগ্রহীরা নখ্ রে, খুব খারাপ মানুষ।” দিদি যে কখন চুপচাপ পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, বুঝতেই পারিনি। দুজনে এগিয়ে গিয়ে চুনিদাকে সান্ত্বনা দিলাম, গ্রমাশ চা করে আনলেন, ব্র্যুন চুনিদার কাঁধে হাত দিয়ে নিঃশব্দে কাঁদলেন, ঝেস্যেইল অপ্রস্তুতভাবে চুপচাপ পাশে দাঁড়ালেন। খানিক বাদে চুনিদা ধাতস্থ হয়ে ব্র্যুনের এগিয়ে-দেওয়া রুমালে চোখ মুছে বললেন, “ক্ষমা করবেন মহামান্য ঝেস্যেইল, আপনি খুব উপকার করলেন আমার। মা-বাবার কী হল, তা নিয়ে রহস্যের উন্মোচন করলেন আপনি। আপনার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। কী করতে পারি আপনার জন্য, বলুন।”
ঝেস্যেইল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন, তারপর গম্ভীর গলায় বললেন, “পরশুর খ-এলা থামাতে হবে, আরাকোক্রাদের কিছুদিনের জন্য আর্কিপেলাগোদেশ ছেড়ে অন্যত্র লুকোতে হবে। স্যানসিলিয়াসের দৃঢ় বিশ্বাস, এই আর্কিপেলাগোদেশেই উর্জুল মেটাম্যাজিকের গুপ্তরহস্যের চাবিকাঠি লুকিয়ে রেখেছেন। এই দেশের সঠিক অবস্থান অত্যন্ত গোপনীয় তথ্য। অনিক্স কাউন্সিলে তার চরও যথেষ্ট ধূর্ত, হয়তো ইতিমধ্যে তারা বুঝে ফেলেছে, এই পোখরাজ সাগরেই রয়েছে আরাকোক্রাদের দেশ। মেটাম্যাজিকের গুপ্তরহস্য পেতে সে গোটা আর্কিপেলাগোদেশ জ্বালিয়ে দিতে পারে। ট্রিলোবাইট চুক্তি অনুযায়ী সর্সারার-বিরোধী দ্বিতীয় বাহিনী তৈরি হচ্ছে, জাদুবিরোধী আর্টিফ্যাক্টও সক্রিয় করা হচ্ছে, কিন্তু তাতে সময় লাগবে। এখন একমাত্র উপায়, পালিয়ে বাঁচা। রাশেভের দিব্যি, আরাকোক্রাদের বলুন, পালিয়ে বাঁচুন।”
ভয়ে আমি দিদির হাতটা চেপে ধরলাম। চুনিদা খুব গম্ভীরভাবে ঝেস্যেইলের কথা শুনলেন, তারপর আমাদের দিকে দেখিয়ে বললেন, “এই দুজনকে দেখে বয়সে কম মনে হলেও, এরা বিশিষ্ট খ, পালক খ-এলা চ্যাম্পিয়ন আর চ জুনিয়র চ্যাম্পিয়ন। এদের মা খ-এলার প্রধান বক্তা পালক, এদের বাবা চঞ্চু, সেই প্রবীণ চঞ্চু—আমার পালক-পিতার বংশধর। এই পাথরজলদেশের সঙ্গে এদের নিবিড় সম্পর্ক, ভীতু এরা নয়, পালানোর লোক নয় এরা। কী বলো পালকদিদিমণি, চ-ভাই? নখ্গুলো এলে ভালো করে পিটিয়ে দিতে পারব না আমরা?”
“আপনি আমার কথা বুঝতে পারছেন না বন্ধু গ্রো-কাশ,” কাতর মিনতি করলেন ঝেস্যেইল, “স্যানসিলিয়াস আর তার দুই সাথি কাছাকাছিই রয়েছে, হয়তো কাল বাদে পরশুই এখানে পৌঁছোবে, আপনাদের পালাতে হবে। আপনারা পেরে উঠবেন না অগ্নিস্ফোরণ মন্ত্রের সঙ্গে।”
দিদি হঠাৎ বলে উঠল, “মহামান্য ঝেস্যেইল, খ-এ আপনাকে অশেষ আমন্ত্রণ। চুনিদা, মানে মহামান্য অলপ্প্রাস গ্রো-কাশ খ-বন্ধু নিশ্চয়ই, কিন্তু তিনি খ নন, তার জন্য আপনাকে কথা বলতে হবে আমাদের প্রবীণদের সঙ্গে, প্রধান পাথরে। আপনি ওই অর্ণবযানে আসুন, আমি পথ দেখিয়ে নিয়ে যাব। চ-মাঞ্চু, তুই চুনিদাকে সঙ্গ দে, আমি খানিক পরেই ফিরব।”
খ-এ ডানা ভাসিয়ে দিল দিদি, অর্ণবযানে অনুসরণ করল ঝেস্যেইল ও গ্রমাশ। গ্রমাশ দেখলাম, খুব সাবধানে অর্ণবযানে উঠলেন। ব্র্যুন বোঝালেন, কয়েকদিন আগে পিঠে চোট পেয়েছেন গ্রমাশ, এখন বেশ কয়েকদিন অর্ণবজলে পড়লে সর্বনাশ, সাঁতার কাটতে পারবেন না।
আমি রয়ে গেলাম। অর্ণবযান থেকে নিজের বাক্সোটি বের করে নিয়েছিলেন ব্র্যুন, পাথরচিত্র দেখালেন আমাকে। পুরব ও নরথ ঘুমের দেশে ঢলে পড়ছে, আকাশে রাতের আলোতারারা একে একে জেগে উঠছে—পাথরচিত্র যে এত অদ্ভুত সুন্দর হতে পারে না, দেখলে বিশ্বাস হত না। আমার আনন্দ দেখে খুশি হয়ে ব্র্যুন বললেন, “আমিও একটু জাদু জানি, বুঝলে চ-ভাই?” আমি তো অবাক। “এই দ্যাখো।” বলে পকেট থেকে একটা অদ্ভুতদর্শন কাঁসার রঙের মুদ্রা বের করে আমার হাতে দিলেন। “পিয়োর ব্রোঞ্জ, চ-ভাই, কিন্তু আসল জাদু অন্য জায়গায়।” ফিশফিশ করে বললেন ব্র্যুন, “এই মুদ্রা হাতে থাকলে তুমি ও তোমার গা-ছুঁয়ে-থাকা আরেকজন ব্যক্তি চাইলেই এখান থেকে ওখান এক নিমেষে চলে যেতে পারবে। এর পোশাকি নাম টেলিপোর্ট কয়েন, আমি এটাকে চলপালাই বলি।” অবাক চোখে মুদ্রাটির দিকে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করলাম, “চলপালাই কেন?” ফিক করে হেসে ব্র্যুন বললেন, “কারণ, এটির আসল স্রষ্টা আমার স্ত্রী, গুইনেরা আয়ার্নফর্জ। একদিন হঠাৎ আমার হাত চেপে ধরে বলে, ‘চল, পালাই!’ কী আশ্চর্য, দেখি, সোজা বিয়ের মণ্ডপে হাজির হয়েছি!” দুজনেই খুব হাসলাম।
চুনিদা কিন্তু অন্যমনস্কভাবে দূরের অর্ণব-আকাশের সন্ধিস্থলের দিকে তাকিয়ে রইল। হয়তো নিজের মা-বাবার কথা ভাবছিল, হয়তো-বা প্রতিশোধের কথা। মাঝে মাঝে নিজের মনেই কী একটা আওড়াচ্ছিল। কান পেতে শুনলাম, এক অদ্ভুত অচেনা ভাষায় চুনিদা একই বাক্য বারে বারে বলে চলেছে, “বোর্টাষ বঈর জাব্লুডি রেহ্ কাক্কু নেহ্”। পরে বুঝেছিলাম, ওটা চুনিদার নিজেদের ভাষা, সবুজ বড়ো অখদের ভাষা, অর্ক্দের ভাষা। এই বাক্যের অর্থও পরে জেনেছিলাম।
________________________________________
প্রায় ঘণ্টা তিনেক পর দিদি একাই ফিরে এল। চুনিদা ও ব্র্যুনকে বিদায় জানিয়ে দিদির সঙ্গে খ-এ ডানা ভাসিয়ে দিলাম।
“ভয় করছে, চ্যাম্পভাই?”
“একদম না,” দৃঢ়কণ্ঠে বললাম, “খ-এ নখ্রা কিস্সু করতে পারবে না। আমাদের শামানদের আশীর্বাদ খ-কে রক্ষা করবে, তুই দেখে নিস।”
দিদি হেসে আমার হাত চেপে বলল, “একদম ঠিক বলেছিস ভাইটি, আমাদের কিস্সু হবে না। সে মহামান্য ঝেস্যেইল যতই প্রবীণদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করুন-না কেন।”
“কী বললেন প্রবীণরা?”
“কী আবার বলবেন, কোনো একটা ভিনগ্রহী নখ্, তার ভয়ে নাকি এতশত বছরের খ-এলা থামিয়ে আমরা পালাব! হেসেই ফেলেনি, সেটা এল্ফ প্রবরের চোদ্দো মায়ের ভাগ্য। তবে একটা জিনিস পালটেছে, খ-এলা এবার কাল হবে, পুরবের এক প্রহরে, আর তোর নামদিনও হবে কাল পুরব-ভোরে। অতএব চ, প্র্যাকটিস করি!”
আমি হতবাক! খ-এলা এগিয়ে এসেছে! তার চেয়েও বড়ো কথা, আমি কাল থেকে আর চ নই, চঞ্চু হব! তারপর খ-এলা চ্যাম্প হয়ে চূর্ণিকে আইসক্রিম হাতে বিয়ে করতে বলব।
“এই যাঃ!” বলে মাঝ-খ-এ হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলাম। চিন্তিত হয়ে দিদি জিজ্ঞেস করল, “এই চ-মাঞ্চু, কী হল রে? দাঁড়িয়ে গেলি যে।” কাঁদো কাঁদো মুখে বললাম, “খ-এলা কালকেই, আর দৈত্য অখ তো কালই পাথরজল নিয়ে আসবে, তাহলে আইসক্রিম কখন বানাব, আর চূর্ণিকে বিয়ে করবই-বা কখন?”
দিদি হোহো-হিহি শব্দে এত জোরে হেসে উঠল, পাশ দিয়ে জোড়া শালিক যাচ্ছিল, ভিরমি খেয়ে এদিক-ওদিক ছিটকে পড়ল। দিদি আমাকে বুকে জড়িয়ে শুধু হাসতেই লাগল, স্যানসিলিয়াস অগ্নিস্ফোরণ মেটাম্যাজিক যেন সুদূর কল্পনার বুদ্বুদ হয়ে বিস্মৃত হল।
বাস্তব বিস্মৃত হয় না যদিও। যারা বলে, হয়, তারা মূর্খ। সরুকান ঠিকই বলেছিলেন, ভিনগ্রহী নখ্ কঠিন বাস্তব।
________________________________________
পরদিন। ভোরবেলা। পুরব সবে জাগ্রত হয়েছেন। আমাদের পাথরবাটির ছাতে রয়েছি আমরা কয়েকজন—মাসিমণি, অর্থাৎ মণিপ্রবীণ; বাবা চঞ্চু; মা পালক; দিদি পালক; বিশেষ অখ অতিথিবৃন্দ চুনিদা, চিত্রকর ও রূপদক্ষ ব্র্যুন, এবং তিনতারায় অপরূপ সংগীত সৃষ্টিতে বিভোর গ্রমাশ।
মণিপ্রবীণ সাবধানে নিজের একটি পালক খুলে হাতে পেতে পুরবমুখ হয়ে বললেন, “হে মহান পুরব, অন্ধকারের আলোক, দুঃখীর আনন্দ, বৃদ্ধের উত্থিত উষ্ণ বাতাস, তরুণের মরুৎস্রোত, সাক্ষী হও, সাক্ষী হও।”
গ্রমাশের তিনতারা বেজে চলল। মা এগিয়ে গেল, মাসিমণির পালকপাতা হাতের উপর নিজের হাত রাখল, নিজের একটা পালক খুলে সেই হাতের উপর রেখে বাবার দিকে ফিরে অদ্ভুত অপার্থিব সুর করে বলল, “হে চঞ্চু, পালক-পিতা, পালকনাথ, তোমার সন্তান তোমার সম্মুখে দণ্ডায়মান, তাকে নাম দাও, নাম দাও। মহান খ সাক্ষী, মহান অর্ণব সাক্ষী, মহান পুরব সাক্ষী। নাম দাও, নাম দাও।”
বাবা এগিয়ে দুজনের পালকপাতা হাতের উপর নিজের হাত রাখল, তারপর আমার দিকে তাকাল, “সাক্ষী পালক, অপর সাক্ষী পালক, অপর সাক্ষী মণি, অপর সাক্ষী চুনিভাই, অপর সাক্ষী মহামান্য গ্রমাশ ব্রো-গার্গ, অপর সাক্ষী মহামান্য ব্র্যুন ব্রোঞ্জবিয়ার্ড, অপর সাক্ষী…” বলে এক পলক আমার পেছনে তাকিয়ে হেসে বলল, “…অপর সাক্ষী চূর্ণি…”
নামদিনের অনুষ্ঠান চলাকালীন যার নামকরণ হতে চলেছে, তার পেছন ফিরলে চলে না, তাহলে নামদিন এক বছর পিছিয়ে যাবে। কী কষ্টে যে নিজেকে সংবরণ করে বাবার কাছে এগিয়ে গেলাম, তা শুধু আমিই জানি। সব কিছু কেমন বিশগুণ উজ্জ্বল হয়ে গেল, অপরূপ ভোর এক অপার্থিব রূপ নিল—নাঃ, সব গুলিয়ে যাচ্ছে, বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াই—
“…সাক্ষীদের মাঝে আমি আজ তোমায়, হে সন্তান, আমার নাম দিলাম।” বলে বাবা নিজের সবুজ-মাখা চঞ্চু আমার মাথায় আলতো করে ঠেকাল, “আজ থেকে তুমি চঞ্চু! আমার পুত্র চঞ্চু, পালক-পুত্র চঞ্চু, পালক-ভ্রাতা চঞ্চু, চুনি-বন্ধু চঞ্চু, চূর্ণি-বর—” বলে ফিক করে হেসে ফেলল বাবাটা।
উফফ, বাবাআআআআ!
“এই, নতুনচঞ্চু, আমায় বে করবি?” চূর্ণি চুপিচুপি খেলায় চ্যাম্পিয়ন।
“আমার… আমি… ইয়ে, মানে…”
“এঃ, নামকরণের সঙ্গে সঙ্গে নাক দিয়ে ঘিলু বেরিয়ে যাচ্ছে, দেখচি।” দিদি পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একটা হালকা গুঁতো মেরে গেল।
কী কেলো!
________________________________________
পুরব এক প্রহর। খ-এলা, অবশেষে। প্রধান পাথরে সবাই একত্রিত। লক্ষ করে দেখলাম, সেই সরুকান গবন্ন আসেননি এবার, তাঁর স্থান নিয়েছেন ঝেস্যেইল। জানি না কেন, এটা দেখে একটু অস্বস্তি লাগল। যা-ই হোক, মা প্রাথমিক ভাষণ দিল, প্রবীণেরা (মাসিমণি অন্যতম) পুরব ও নরথের আশীর্বাদ চেয়ে এবারের খ-এলার উদ্বোধন করল। গ্রমাশের তিনতারা বেজে উঠল, চুনিদার রংজলের খেলা সবাইকে মুগ্ধ করল। তারপর শুরু হল একে একে খ-এলার বিভিন্ন খেলা।
প্রথমেই, উড়দৌড়। পাথরপাহাড় রুবারু খ-দেশের সব চেয়ে উঁচু পর্বত, তার মাথা থেকে খ-এ নিজেকে ভাসিয়ে দিতে হবে, ডানা একবারমাত্র ঝাপটানো যাবে, তারপর সবই খ-এর ইচ্ছে ও খেলোয়াড়ের দক্ষতা। লক্ষ্য দূরে একটি অতিক্ষুদ্র দ্বীপ। যে লক্ষ্যের সব চেয়ে কাছে পৌঁছোতে পারবে, সে জয়ী।
দিদির সঙ্গে কতবার যে এই খেলার মহড়া নিয়েছি, তার হিসাব নেই। দিদি এই খেলার গত দুবারের চ্যাম্পিয়ন। উপরগরমহাওয়া কোথায় নিতে হবে, কোথায় ছাড়তে হবে, দিদির সুনিপুণ শিক্ষায় এসব আমার নখদর্পণে। নির্ভুল অনুমানে দ্বীপটার ঠিক মাঝখানে গিয়ে নামলাম। আমার একদা জুনিয়র বিভাগের প্রতিদ্বন্দ্বী চো, এখন সে চোখ নামে পরিচিত, দ্বীপটির একদম কিনারায় কোনোক্রমে পা রাখতে পারল। দিব্যি করল। খুবই যোগ্য দ্বিতীয় স্থান, সন্দেহ নেই।
দ্বিতীয় খেলা, রুমালকই। প্রত্যেক খেলোয়াড়ের কোমরে গোঁজা একটা রুমাল। প্রতিদ্বন্দ্বীর কোমর থেকে রুমাল ছিনিয়ে নিতে পারলে সে বাদ। শক্তির চেয়েও কৌশলের দাম এখানে বেশি। সবাই একসঙ্গে শুরু করবে, অতএব চরম বিশৃঙ্খলা হতে বাধ্য। অভিজ্ঞ খেলোয়াড় শুরুতে ছোটো ছোটো দল বেঁধে একক খেলোয়াড়দের উপর হামলে পড়বে, তারপর খেলোয়াড়ের সংখ্যা কমে এলে সবাই নিজ নিজ ব্যবস্থা দেখবে। বাবা এককালে এই খেলার চ্যাম্পিয়ন ছিল। বাবার নির্দেশমতো কাজ করলাম, শেষ দুই খেলোয়াড় রইলাম শুধু আমি ও চোখ। মল্লযুদ্ধ শুরু হল, একে অপরের চুক ধরে ফেলছি, কেউ কারও চেয়ে কম নয়। চোখ হঠাৎ নীচের দিকে ডাইভ মারল, আমার সেই ঘূর্ণি ডাইভ। এক মুহূর্ত হকচকিয়ে গিয়ে আমিও ডাইভ দিলাম, পরমুহূর্তে নিজের ভুলটা বুঝতে পারলাম। গতবারে জু-চ্যাম্পে এই একইভাবে ডাইভ দিয়েছিলাম, আমার গতির সঙ্গে চোখ পাল্লা দিতে পারেনি সেদিন। আজও পারল না, কিন্তু সেটাই তার কৌশল। আমি ডাইভ নিয়ে ডানা শরীরের সঙ্গে সেঁটে মুহূর্তের মধ্যে অনেকটা নেমে গেলাম, চোখ হঠাৎ ডানা খুলে মেলে ধরল। ব্যাস, অমনি তার গতি দুম করে কমে এল। আমি সোঁ করে চোখকে পেরিয়ে বেরিয়ে গেলাম, চোখও ক্ষিপ্র গতিতে কোমর থেকে আমার রুমালটা বাগিয়ে নিল।
হাততালি দিতে দিতে চোখের পাশে গিয়ে ভাসলাম। “গতিই সব নয় ব্রাদার,” হেসে বলল চোখ, “১-১ ভাই, রোসো, চক্রগোলক অভি ভি বাকি হ্যায়।” দন্তবিকাশ করে বললাম।
বিশ্রাম বিরতি, মধ্যাহ্নভোজন। ঝেস্যেইল দেখলাম, ফের প্রবীণদের সঙ্গে বসেছেন, হাত নেড়ে ব্যস্তভাবে কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করছেন। দিদি পাশে এসে দাঁড়াল, “কী রে, তোর চূর্ণি কই? ম্যাডাম চূর্ণিমালা? দেখছি না যে। অত যে গপ্প বললাম, মেটাম্যাজিক উর্জুল হ্যানত্যান, মেয়েটা অন্তত দেখা তো দেবে।”
যথাযথ প্রশ্ন। চূর্ণিকে সারাদিন প্রায় দেখিইনি বলতে গেলে। গেল কই হবু বউটা? “বাদ দে,” হেসে বললাম দিদিকে, “তোর নাচ-গানের প্রস্তুতি শেষ?”
“ইয়্যাকদম,” তুড়ি মেরে বলল দিদি, “তোদের চক্রগোলক শেষ হওয়ার খানিক বাদেই আমাদের শুরু। কী মনে হয়, এবারের চ্যাম্প? সিনিয়র অত সহজ নয় কিন্তু।”
তুমুল আত্মবিশ্বাসের সুরে বললাম, “আলবাত! অপর দলে কে? সেই তো চোখবাবাজি, আমি ওর চেয়ে ঢের ভালো চক্রধারী।”
জবাবে দিদি শুধু একটা চোখের কোলে আলোর ঝিলিক খাওয়ার মতো হাসি হেসে চলে গেল। কেসটা কী? আই দ্য সন্দেহ।
শেষ খেলা, চক্রগোলক। দুই দল, প্রতি দলের একজন চক্রধারী, বাকিরা গোলকি। গোলকিদের কাজ হল গোলকটাকে ছুড়ে অপর দলের চক্রভেদ করা, করতে পারলে দলের খাতায় এক দাগ। চক্রধারীরা চক্রটিকে এদিক-ওদিক নাড়াতে নিশ্চয়ই পারে, কিন্তু চক্রটি যেন কোনোমতেই চক্রধারীদের হাত থেকে পিছলে না যায়, তাহলে অন্য দলের খাতায় এক দাগ বসবে। এক ঘণ্টার খেলা, খেলাশেষে যে দলের বেশি দাগ, সে জয়ী।
আমার দলের চক্রধারী আমি। অপর দলের চক্রধারী চোখ। আমরা দুজনেই প্রায় অপ্রতিরোধ্য, যদিও আমি বেশি ভালো, তাই জেতার সম্ভাবনা আমাদেরই বেশি। কিন্তু এ কী! ও দলের এক গোলকি শেষ মুহূর্তে বদল হচ্ছে যে। বদলি গোলকি যে হবু বউ চূর্ণিমালা!
কী কেলো!
ঘণ্টাখানেক পর সবাই ক্লান্ত, আমার দলের খাতায় ৭ দাগ, চোখের দলের খাতায় ১২ দাগ। চোখ আমার কাছে এসে অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল, “কী ব্যাপার, চঞ্চুরাম? ১২ দাগ খাওয়ার মতো বান্দা তো তুমি নও। আর এই নতুন গোলকিটা… চূর্ণি… এ একাই ৫ দাগ! অভূতপূর্ব! চ্যাম্প হবে বলে এত চ্যাঁচালে, শেষ মুহূর্তে কেস কিশমিশ? কেসটা কী, বস?”
চোখের কাঁধে হাত রেখে হেসে বললাম, “ব্রাদার, বড়ো যুদ্ধ জিততে গেলে ছোটো কিছু যুদ্ধ হারতে হয়, ব্রাদার।”
চোখ বুদ্ধিমান খ। আমার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে পুরো ব্যাপারটা আঁচ করে হোহো করে হেসে উঠে আমার পিঠে একটা রামথাবড়া মেরে বলল, “চ, তোর বাবার পায়েসক্রিম খাওয়াবি চ, চ চ…”
মনটা ভালো হয়ে গেল। মানে ভালোই ছিল, আরও ভালো হল। চোখ সেই ছোটোবেলা থেকে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী, এই প্রথম সে আমায় ‘তুই’ বলে ডাকল। একটা নতুন জীবনবন্ধু পেলাম। নতুন বউ, নতুন জীবনবন্ধু! দিনটা বেশ কাটল। আহা, আইসক্রিমটা যদি করে রাখতে পারতাম। যা-ই হোক, পেট পুরে পায়েসক্রিম খেয়ে দুজনে যখন ফিরলাম, দিদিদের নাচ-গানের অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি শেষ। পুরব তখন অর্ণব-আকাশের সন্ধিস্থলে ঢলে পড়েছে, নরথ নিজস্থান নিয়েছে আকাশের প্রথম চৌখুপিতে। আকাশে নীলের বদলে বেগুনি রঙের প্রলেপ পড়েছে। প্রধান পাথর শ্রোতা-দর্শকদের ভিড়ে থিকথিক করছে। দিদিদের অনুষ্ঠান শুরু হল, পাশের খালি পাথরটুলে তিনি এসে বসে আমার হাতটা বগলদাবা করে কানের কাছে ফিশফিশ করে বললেন, “জেতাতে বলেছি, বোকারাম?”
মুখের আপনা থেকে একটা বিশাল হাসি ফুটে উঠল, নরথের আধা নীল-আধা বেগুনি আলোও মনে হতে লাগল যেন পুরবের উজ্জ্বল জ্যোতি। ওর হাতটা টেনে নিজের হাতে নিয়ে বোকা-বোকা হেসে হেসে বললাম, “বউ!”
চূর্ণি হেসে ফেলল। আঃ, আনন্দ যদি পাথরে খোদাই হত, হে মহান খ!
নাচ-গান তুঙ্গে উঠেছিল। নিশ্চিত হলাম, দিদির মতো কলানিপুণ ও দক্ষ নর্তনগায়িকা বোধহয় সমগ্র খ-এর ইতিহাসে আগে কখনও আসেনি। চূর্ণিও মুগ্ধ হয়ে অনুষ্ঠান দেখছিল, বলল, “দ্যাখো দ্যাখো, এত সুন্দর ওরা, যেন পেছনে আরেকটি নরথ জেগে উঠেছে, তা-ই না?”
আমার চোখে ধাঁধা লেগে গিছল, চূর্ণির কথায় সংবিৎ ফিরল। আরেকটি নরথ মানে? দিদিরা ভালো, কিন্তু এত ভালো জানতাম না তো। ভালো করে তাকাতে-না তাকাতেই কাছ থেকে চুনিদার আর্তচিৎকার ভেসে এল, “সাবধান! সাবধান! অগ্নিস্ফোরণ! অগ্নিস্ফোরণ!”
নখ্!
বিশেষ কিছু ভাববার, করবার সুযোগ পেলাম না। পরে শুনেছিলাম, স্যানসিলিয়াস ও তার সাথিরা পরপর ন-টা অগ্নিস্ফোরণ গোলক আমাদের দিকে তাক করে ছুড়েছিল—ছ-টার নিশানা ছিল প্রধান পাথর চাতালে বসা অগুনতি শ্রোতা-দর্শক, বাকি তিনটে ধেয়ে গিছল ভাসমান শিল্পীদের দিকে, দিদির দিকে। জবাবে গ্রমাশ তিনতারার তারে সুর বেঁধে বিপরীত জাদুমন্ত্র প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছিলেন, সফল প্রায় হয়েছিলেন, শেষ মুহূর্তে কে যেন তাঁকে ধাক্কা মেরে অর্ণবজলে ফেলে দেয়। ভিনগ্রহীদের নিশানায় সেদিন কোনো ভুল ছিল না। হে খ, কেন, কেন?
বাবা-মা আমাদের পাশেই বসে ছিল। বিপদ দেখে আমাদের দিকে ফিরে দুজনে একসঙ্গে বজ্রতরঙ্গ মন্ত্র প্রয়োগ করলেন, আমি আর চূর্ণি অনেক দূরে ছিটকে গিয়ে পড়লুম। তার পরেই পরপর প্রবল বিস্ফোরণ। সব অন্ধকার।
________________________________________
জ্ঞান ফিরল চূর্ণির ডাকে, পাথরগর্তে জমা বরুণজল মুখে-মাথায় ছিটিয়ে সে আমায় উঠিয়ে বসাল। মাথা ঝিমঝিম, চোখ প্রায় অন্ধ, তাও খানিক দূরে পড়ে-থাকা চুনিদাকে চিনতে অসুবিধে হল না। হামাগুড়ি দিয়ে দুজনে চুনিদার কাছে গেলাম। আহা, অত সুন্দর চুনির মতো লাল চোখ দুটি দাদাটার! একটা পুড়ে কালো হয়ে গেছে, অন্যটা নেই।
টলতে টলতে প্রধান পাথরের চাতালের কাছে এলাম। সেই ভয়াল অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে কিছু আর অবশিষ্ট নেই—খ, অখ, কেউ নেই, কেউ নেই। সব শেষ। সব শেষ।
না, সব শেষ নয়। আগুনবেষ্টিত হয়ে সম্পূর্ণ অক্ষত দাঁড়িয়ে রয়েছে অনিক্স কাউন্সিলের মহামান্য সরুকান হাইএল্ফ শ্রীঝেস্যেইল সিলভারফ্রন্ড। স্যানসিলিয়াস ও সাঙ্গোপাঙ্গ ধীর গতিতে ভাসতে ভাসতে সেই তপ্ত আগুনের মধ্যেই পা রাখল। ঝেস্যেইল আমাদের দেখতে পেয়ে মনে হল, অবাকই হল। তারপর বলল, “জ্বলছি না কেন, তা-ই তো?”
চুপ করে রইলাম। কী-ই-বা বলার আছে আর? বিশ্বাসঘাতক! নখ্!
“মেটাম্যাজিক,” বলল প্রবঞ্চক সরুকানটা, “অগ্নিস্ফোরণ গোলক নিজের পায়ের দিকে তাক করে নিক্ষেপ করলেও নিজের কোনো ক্ষতি হবে না। এহেন জাদুকরকে গ্রেফতার করা অসম্ভব, আটকে রাখা অসম্ভব, নিয়ন্ত্রণ করা… আঁক…”
নিমেষে আগুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠল সরুকান ঝেস্যেইল। নিমেষে ছাই! ভিনগ্রহী স্যানসিলিয়াসের দিকে তাকালাম। কাঁধ ঝাঁকিয়ে সে বলল, “লোকটা বড়ো বেশি কথা বলে।”
“কিন্তু কেন?” কাতরস্বরে বলল চূর্ণি, “মেটাম্যাজিকের গুপ্তরহস্য উর্জুল এখানে রেখে যাননি।”
“না,” হাই তুলে বলল স্যানসিলিয়াস, “নিজের কাছেই রেখেছিল। মারলাম অর্ক্টাকে, তারপর আর কী, এল্ফটার দেওয়া স্পেলস্ক্রোল পড়ে স্পিক উইথ ডেড ঝাড়লাম, লাশটাকে পাঁচটা প্রশ্ন করলাম, সব গুপ্তরহস্য-ফহস্য জল-কে-পানি হয়ে গেল।”
“মেটাম্যাজিকের রহস্য জানেন, তাও এলেন এখানে? কেন? এত ধ্বংস করে কী লাভ?” ধরা গলায় বললাম।
উদাস গলায় বলল স্যানসিলিয়াস, “শিকার। মেটাম্যাজিক মজার জিনিস, কিন্তু ভাই পাখির পো, তোদের শিকার করে কাবাব খাওয়ার মজাটাই আলাদা। সবে তো সন্ধে, শিকার তো অনেক বাকি, তোরা তো ঝাঁকে ঝাঁকে থাকিস এই আশপাশেই, না? প্রচুর কাবাব হবে আজ। চলি, বুঝলি। ও হ্যাঁ, নিজের পরিচয়টাই তো দিতে ভুলে গেছি। থুড়ি। আমি হলাম শ্রীল শ্রীযুক্ত স্যানসিলিয়াস ফায়ারফ্রেন্ড, এঁরা আমার বিশিষ্ট দুই বন্ধু, পরিচয় জেনে কাজ নেই।”
মনের মধ্যে এক অদ্ভুত শূন্যতা ছিল। সব… শেষ? মাথা ঝাঁকিয়ে সেটা কাটিয়ে উঠে রেগে দাঁতে দাঁত চেপে বললাম, “জানি তোরা কে। তোরা নখ্, ন-খ, ন-অখ। তোদের চেয়ে ঘৃণ্য জীব রাশেভে আর দুটি নেই, ভিনগ্রহী।”
একটু যেন বিরক্ত হল স্যানসিলিয়াস। “দুর বাবা, আবার সেই নখ্ ভিনগ্রহী যত্তসব। ওরে কীট, তোরা ভিনগ্রহী, আমরা আসলি আদমি। আদি পৃথিবী গ্রহের বাসিন্দা আমরা, জেনে রাখ, আমরা হলাম মানুষ! হি-উ-ম্যান! বুঝলি? হিউ-ম্যান! আর সমগ্র অসীম অকাল একদিন আমাদের মুষ্টিগত হবে!” এই বলে স্যানসিলিয়াস নিজের ডান হাতটা মুখের সামনে এনে তুড়ি মারল।
লোকটার হাতে আগুনের ফুলকি দেখেই বুঝেছিলাম, মেটাম্যাজিক শক্তিচালিত অগ্নিস্ফোরণ আসছে। এক হাতে শক্ত করে চূর্ণির হাতটা চেপে ধরে ব্র্যুনের দেওয়া মুদ্রাটা অন্য হাতে নিয়ে মনে মনে বললাম, “চলপালাই!”
________________________________________
চূর্ণি ও আমি শপথ নিয়েছি, নখ্গুলোকে একদিন না একদিন খুঁজে বের করে উচিত শাস্তি দেব, খ-দেশের গণহত্যার বদলা নেব। ততদিন চলবে আমাদের জাদুশিক্ষা, যাতে পরের বার মেটাম্যাজিক হোক কি সর্সারার, কেউ আমাদের সামনে দাঁড়াতে না পারে। পুরব হোক কি নরথ, একটাই মন্ত্র দুজনে জপ করব অবিরাম, “বোর্টাষ বঈর জাব্লুডি রেহ্ কাক্কু…নেহ্!” রিভেঞ্জ ইজ় আ ডিশ বেস্ট সার্ভড… কোল্ড।
Tags: একাদশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা, সো ঘো
