প্রোথিত
লেখক: সায়ন দাস
শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব
ল্যান্ডিং প্যাড থেকে নামতে নামতে ডক্টর সমীর আগাসে লক্ষ করলেন, গবেষণা ঘাঁটিটা স্বাভাবিকের চেয়ে ঢের বেশি নিস্তব্ধ। বায়োডোমের বাইরে একটানা হাওয়া বইছে। দিগন্তরেখায় অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সেই খাড়া কাঠামোগুলো—সারি সারি ফ্যাকাশে মিনার, যেন কোনো প্রাচীন সভ্যতার কঙ্কালসার ধ্বংসাবশেষ। তানিয়া জায়গাটাকে চিহ্নিত করেছিল ‘মনোলিথ জ়োন’ নামে।
তিনি তখন বলেছিলেন, “আগে স্যাম্পল কালেকশন শেষ করো। ওদিকে এখনই যাওয়ার দরকার নেই।”
এই গ্রহের নাম টেথিস প্রাইম। তাঁদের মহাকাশযান অবতরণ করেছে, আজ পাঁচ দিন হল। এই ক-দিন ল্যাবরেটরির ভেতরেই অজস্র পরীক্ষানিরীক্ষা চলেছে, কিন্তু প্রতিকূল পরিবেশের কথা ভেবে বাইরে পা রাখার অনুমতি তখনও মেলেনি। তানিয়ার কিন্তু আর তর সইছিল না। হাজারবার বারণ করা সত্ত্বেও ডক্টর আগাসেকে না জানিয়েই সে আজ একা স্পেসশিপ ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে।
মেইন এয়ারলকের সামনে একটি তরুণ দাঁড়িয়ে ছিল—হাতে হেলমেট, চোখে স্পষ্ট উদ্বেগ। নেম-ব্যাজে লেখা: অর্ণব সেন, ফিল্ড টেকনিশিয়ান। সমীরকে এগিয়ে আসতে দেখে ছেলেটা ঋজু হয়ে দাঁড়াল।
“ডক্টর আগাসে। আপনাকে…”
“তানিয়া কোথায়?”
অর্ণব থমকে গেল। তারপর চোখ নামিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “স্যার, উনি… উনি বাইরে গেছেন। প্রায় চার ঘণ্টা আগে।”
সমীর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। কানে আসছে বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ আর দূরে একনাগাড়ে চলা জেনারেটরের ঘড়ঘড় আওয়াজ। সামান্য স্তব্ধতার পর নীচুস্বরে জিজ্ঞেস করলেন, “একা?”
“হ্যাঁ, স্যার।”
“সঙ্গে কী কী সরঞ্জাম নিয়েছে?”
“এমার্জেন্সি প্যাক, পোর্টেবল সিসমিক স্ক্যানার আর একটা বিকন। রোভার নেয়নি—ফুয়েল লো ছিল।” অর্ণব একটু ইতস্তত করে যোগ করল, “আর… আর ওর ট্যাবলেটটা। ওতেই ওর সব ডেটা সেভ করা আছে।”
সমীর এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “কোনদিকে গেছে ও?”
অর্ণব হাত উঁচিয়ে দিগন্তের সেই ফ্যাকাশে মিনারগুলোর দিক্নির্দেশ করল। “মনোলিথ জ়োনে। উত্তর-পশ্চিমে। পাঁচ-সাত কিলোমিটার হবে।”
“রেডিয়ো কনট্যাক্ট?”
“প্রথম দু-ঘণ্টা ছিল। বলেছিল, সব ঠিক আছে। তারপর থেকেই আর সিগন্যাল পাচ্ছি না। জায়গাটাতে তীব্র ম্যাগনেটিক ইনটারফিয়ারেন্স আছে বলে মনে হচ্ছে।”
“আমায় আগে জানাওনি কেন?”
“ইয়ে… মানে… আপনি ল্যাবে ব্যস্ত ছিলেন, আর উনি তো আপনার সঙ্গেই দেখা করে বেরোলেন।”
সমীর চোয়াল শক্ত করলেন। অর্ণব ঠিকই বলছে। মনে পড়ল কয়েক ঘণ্টার আগের সেই কথা। তানিয়ার ক্লান্ত মুখ, চোখে উত্তেজনা আর একরাশ হতাশার অদ্ভুত মিশ্রণ। ও বলেছিল, “বাবা, এই প্যাটার্নটা দ্যাখো। এগুলো স্থির কোনো কাঠামো নয়… এরা নড়ছে। কক্ষপথ থেকে আমরা যখন অবজ়ার্ভ করছিলাম, তখন থেকেই আমি এটা ট্র্যাক করছি। এরা নড়ছে, বাবা, খুব ধীর গতিতে হলেও নড়ছে!”
আর তিনি অতি-সাবধানি বিজ্ঞানীর মতো বলেছিলেন, “তানিয়া, তোর তথ্য এখনও অসম্পূর্ণ। স্যাম্পল সাইজ় খুবই কম। আর-একটু সময় দাও।”
“আর কত সময়, বাবা? এখানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা মানে…”
“মানে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি মেনে চলা। তাড়াহুড়ো করে কোনো ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছোনো যায় না।”
সমীর মুখ তুলে অর্ণবের দিকে তাকালেন। “রোভারে ঠিক কতটুকু জ্বালানি আছে?”
“ওয়ান-ওয়ে ট্রিপের মতো আছে, স্যার। কিন্তু ফেরার মতো নেই।”
“ঠিক আছে।” সমীর ঘুরে দাঁড়ালেন, “একটা এমার্জেন্সি কিট তৈরি করো। মেডিক্যাল সাপ্লাই, ওয়াটার পিউরিফায়ার আর একটা স্পেয়ার বিকন দাও। আর আমার সুটের অক্সিজেন ফুল চার্জ করে দাও।”
“স্যার, আপনি একা…”
“হেঁটেই যাব।”
“স্যার, ওখানকার ভূপ্রকৃতি বড়োই অনিশ্চিত। আর মনোলিথ জ়োনে ঠিক কী বিপদ লুকিয়ে আছে, আমরা জানি না। তানিয়াই প্রথম ওদিকে…”
“ও একা গিয়েছে,” সমীর ধীরে বললেন, “আর আমি পারব না?”
সমীর একটু হাসলেন—ম্লান, বিষণ্ণ হাসি। “অর্ণব, আমি ওর বাবা। আমিই ওকে এই অবস্থায় ঠেলে দিয়েছি। মেয়েটা বড্ড জেদি। এখন আমাকে যেতেই হবে।”
সমীর জানালার দিকে তাকালেন। দূরে সেই ফ্যাকাশে মিনারগুলো নিঃসাড় দাঁড়িয়ে। অচল, জড়। কিন্তু তানিয়া বলেছিল, ওরা নড়ছে।
* * *
যাত্রা শুরুর প্রথম এক ঘণ্টা মনে হয়েছিল সব কিছুই স্বাভাবিক। জমি শক্ত, সামান্য বালুকাময়। যত্রতত্র পাথরের কুচি ছড়ানো থাকলেও হাঁটতে বিশেষ বেগ পেতে হচ্ছিল না। হেলমেটের ভেতর নিজের নিশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলেন সমীর। বয়স বাহান্ন পেরিয়ে গিয়েছে, কাঁচাপাকা চুল আর চোখের কোণে সূক্ষ্ম বলিরেখা তাঁর অভিজ্ঞতারই সাক্ষ্য দেয়। দীর্ঘ কয়েক দশক ল্যাবরেটরির শীতাতপনিয়ন্ত্রিত নিরাপদ চার দেয়ালের ভেতর কাটানোর পর এই হাড়ভাঙা খাটুনি আর প্রতিকূল পরিবেশ তাঁর বর্ষীয়ান শরীরে সইছিল না, কিন্তু দমে যাওয়ার পাত্র তিনি নন।
তানিয়া এই পথেই গিয়েছে। মাত্র ঘণ্টা চারেক আগে।
দিগন্তরেখায় মনোলিথগুলো ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠল। দূর থেকে মনে হয়েছিল নিছক পাহাড়ের সারি, কিন্তু কাছে আসতেই বোঝা গেল—এগুলো স্বতন্ত্র একেকটি কাঠামো। ঋজু, দীর্ঘকায়। ফ্যাকাশে হলদেটে-সাদা রং, ঠিক যেন প্রাচীন কোনো দানবের হাড়ের ফসিল। কোনোটা দশ মিটার উঁচু, কোনোটা পনেরো। আকৃতিতে অসাম্য থাকলেও এদের গড়নে একটা অদ্ভুত মিল আছে—কিছুটা মসৃণ, আবার কোথাও গভীর খাঁজকাটা।
সমীরের মনে পড়ে গেল পৃথিবীর আদিম যুগের সেই রহস্যময় ‘প্রোটোট্যাক্সাইটিস’-এর কথা, যার সঙ্গে এগুলোর অদ্ভুত সাদৃশ্য। প্রায় চল্লিশ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে দাপট-দেখানো এই প্রোটোট্যাক্সাইটিস ছিল আসলে বিশালাকার এক ধরনের ছত্রাক, যা প্রাচীন বৃক্ষকাণ্ডের মতো জীবাশ্ম হয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। টেথিস প্রাইমের এই মিনারগুলো যেন সেই আদিম ছত্রাকেরই এক ভিনগ্রহী সংস্করণ।
সব চেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হল এদের বিন্যাস। অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে, প্রায় সমান দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে মিনারগুলো। প্রকৃতির খেয়ালে এমন জ্যামিতিক গঠন সচরাচর দেখা যায় না।
সমীর দাঁড়িয়ে পড়ে স্ক্যানারটা চালু করলেন। ছোট্ট যন্ত্রটা হাতে ধরে মনোলিথগুলোর দিকে তাক করতেই স্ক্রিনে সংকেত ভেসে উঠল:
গঠন: সিলিকন-কার্বন ম্যাট্রিক্স, জৈব তন্তু (৩৭%)
ঘনত্ব: ০.৮ গ্রাম/সিসি
তাপমাত্রা: পরিবেশ +২° সে.
কম্পন: শনাক্ত করা যায়নি
জৈব তন্তু! অথচ কোনো কম্পন নেই, কোনো বিপাকীয় উত্তাপ নেই—আদ্যোপান্ত নির্বিকার।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্ক্যানারটা পকেটে পুরলেন সমীর। আবার হাঁটা শুরু করলেন।
মনোলিথদের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে তিনি এগিয়ে চললেন। এক, দুই, তিন—মিনারগুলো গুনতে গুনতে। একটার গায়ে হাত রাখলেন—স্পর্শটা রুক্ষ, শীতল। তবে ঠিক পাথরের মতো অনমনীয় নয়; একটা আশ্চর্য স্থিতিস্থাপকতা আছে, যেন জমাট-বাঁধা শক্ত কোনো স্পঞ্জ।
মিনিট দশেক পর সমীর লক্ষ করলেন—একটা মিনার, যেটাকে তিনি আগেই পেরিয়ে এসেছেন বলে মনে হচ্ছে, সেটি আবার ঠিক তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে। হুবহু এক গড়ন, সেই একই ফাটল। মনে একটা খটকা লাগল—পথ হারিয়ে কি তবে বৃত্তাকারে ঘুরছেন তিনি? কিন্তু কবজিতে থাকা কম্পাসটা স্থিরভাবে উত্তর-পশ্চিমদিকই নির্দেশ করছে। ভুল হওয়ার তো অবকাশ নেই।
থমকে দাঁড়িয়ে চারপাশটা একবার দেখে নিলেন।
সব ক-টা মিনার দেখতে প্রায় একই রকম। বৈচিত্র্যহীন এই প্রান্তরে দৃষ্টির বিভ্রান্তি ঘটা অস্বাভাবিক নয়। তার উপর শারীরিক ক্লান্তিও এসে ভর করেছে, হয়তো চশমার কাচের আড়ালে চোখ দুটোও মাঝে মাঝে ধোঁকা দিচ্ছে।
তিনি আবার পা বাড়ালেন।
কিন্তু কয়েক কদম যেতেই মনে হল, পায়ের তলার মাটিটা যেন বদলে গিয়েছে। আগে যে পথটা একেবারে সমতল ছিল, সেখানে এখন সামান্য ঢালু ভাব। থমকে দাঁড়ালেন তিনি। পরক্ষণেই মনে হল, না, ঠিকই তো আছে। ঢাল কোথায়? সমতলই তো।
মনের ভুল?
নিজেকে নিজেই প্রবোধ দিলেন সমীর। চারদিকের ভূপ্রকৃতি বড়ো একঘেয়ে। আলো পড়ার কায়দাও একরকম। নির্জন, ধূসর পরিবেশে মানুষের মস্তিষ্ক প্রায়শই ভুল সংকেত পাঠায়—যেখানে কিছুই নেই, সেখানেও সে প্যাটার্ন খোঁজে।
পায়ের চিহ্ন দেখতে পেলেন মিনিট পনেরো পরে।
সমীর থমকে দাঁড়ালেন। মাটিতে বুটের ছাপ স্পষ্ট—তানিয়ার পায়ের মাপ, একেবারে তাজা। এখানকার বালি কিছুটা নরম বলেই চিহ্নগুলো রয়ে গিয়েছে। তিনি হাঁটু গেড়ে বসে আঙুল দিয়ে ছাপগুলো ছুঁয়ে দেখলেন। মাটির গভীরতা দেখে মনে হল, তানিয়া খুব দ্রুত হাঁটছিল। দৌড়োচ্ছিল।
পায়ের ছাপের পাশে আরও কিছু অদ্ভুত দাগ—যেন ভারী কিছু টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। চওড়া, অগভীর পাঁচ-ছয়টি সমান্তরাল খাঁজ। কোনো জানোয়ারের নখর, নাকি…
সমীর হেলমেটের কমিউনিকেটর চালু করলেন। “তানিয়া? তানিয়া, শুনতে পাচ্ছিস?”
কেবল স্ট্যাটিকের কর্কশ শব্দ শোনা গেল।
“তানিয়া, বাবা বলছি। উত্তর দে।”
কোনো উত্তর নেই।
তিনি ফ্রিকোয়েন্সি বদলালেন। “তানিয়া, তুই কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছিস? রেসপন্ড কর!”
সব নিশ্চুপ।
সমীর উঠে দাঁড়িয়ে পায়ের চিহ্ন ধরে এগোতে লাগলেন। মনোলিথগুলোর বুক চিরে পথটা এঁকেবেঁকে গিয়েছে।
হঠাৎ তাঁর নজরে এল একটি ছোটো প্রাণীর পায়ের ছাপ। চারপেয়ে, বিড়ালের মতো আকৃতি, কিন্তু গড়ন আলাদা। পাঁচটা আঙুল, সামান্য নখর। টেথিস প্রাইমে এ ধরনের প্রাণী আগেও দেখা গিয়েছে—নিরীহ, তৃণভোজী; সবাই এদের ‘স্ক্যাম্পার’ বলে ডাকে।
চিহ্নগুলো কয়েক মিটার যাওয়ার পর হঠাৎ উধাও হয়ে গেল। যেন প্রাণীটি হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। সমীর চারপাশটা খুঁটিয়ে দেখলেন। রক্তের কোনো দাগ নেই, ধস্তাধস্তির চিহ্নও নেই। সমীরের বুকের ভেতর এক হিমশীতল অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল।
ভয়। তাঁর শিরদাঁড়া দিয়ে ভয়ের স্রোত বয়ে গেল।
তিনি আরও দ্রুত পা চালালেন তানিয়ার পায়ের ছাপ অনুসরণ করে। এবার রীতিমতো দৌড়োলেন।
হঠাৎ দেখলেন, মাটিতে পড়ে আছে একটি ছোট্ট যন্ত্র। ধাতব কালো রঙের গায়ে তানিয়ার নামের স্টিকার সাঁটা। একটি সেন্সর ইউনিট। ছুটে গিয়ে ওটা তুলে নিলেন তিনি। যন্ত্রটির স্ক্রিনে বড়োসড়ো ফাটল। একপাশে এমন দাগ, যেন কেউ আছাড় দিয়ে ওটা ছুড়ে ফেলেছে, অথবা পালাতে গিয়ে ওটা হাত থেকে পড়ে গিয়েছে।
“তানিয়া!” তিনি চিৎকার করে উঠলেন। কমিউনিকেটর নয়, সরাসরি গলার স্বরে। “তানিয়া!”
নিস্তব্ধতা। আর ঠিক তারপরেই—
“বাবা?”
কণ্ঠস্বর ক্ষীণ, কিন্তু তানিয়ারই গলা।
সমীর বিদ্যুদ্বেগে ঘুরে দাঁড়ালেন। “কোথায় তুই?”
“এদিকে। ডানদিকে। মনোলিথগুলোর মাঝে একটা পাথরের খাঁজে।” গলাটা কাঁপছে সামান্য। “তাড়াতাড়ি এসো, কিন্তু খুব সাবধানে।”
সমীর দৌড়োলেন। মনোলিথের গোলকধাঁধা আর পাথরের ফাটল পেরিয়ে যখন পৌঁছোলেন, তখন তাঁর হৃৎস্পন্দন কানের পর্দায় হাতুড়ি পেটাচ্ছে। ফুসফুসে বাতাস ফুরিয়ে এসেছে।
অবশেষে দেখা মিলল তানিয়ার। একটা প্রকাণ্ড পাথরের নীচে আধা-খাঁজকাটা গুহার মতো জায়গায় ও বসে আছে। চোখ দুটো এখনও সজাগ, জ্বলজ্বল করছে, কিন্তু তাতে স্পষ্ট ভয়। কোলের উপর রাখা ট্যাবলেট, স্ক্রিনে বিচিত্র কোনো চার্ট।
সমীর ওর সামনে হাঁটু গেড়ে বসলেন। “তানিয়া…”
“বাবা, তুমি কেন এলে?” তানিয়ার গলায় বিরক্তি নয়, বরং এক ধরনের চাপা হাহাকার, “তোমার এখানে আসার কথা ছিল না।”
“তুই ঠিক আছিস?” সমীর ওর কাঁধে হাত রাখলেন, “কোথাও চোট লেগেছে?”
“না। বড্ড ক্লান্ত। জল শেষ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু জখম হইনি।” তানিয়া এক মুহূর্তের জন্য চোখ বুজল। তারপর আবার চাইল। “এখনও পর্যন্ত তো হইনি।”
সমীর ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। একবার জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে হল, কিন্তু পারলেন না। তানিয়াও নড়ল না, পাথরের মূর্তির মতো বসে রইল ট্যাবলেটটা শক্ত করে ধরে। দুজনের মাঝখানে যেন একটা অদৃশ্য দেয়াল।
সমীর নিজের প্যাক খুলে জলের পাউচ বের করলেন। “এটা খা। অল্প অল্প করে চুমুক দে।”
তানিয়া নিল, কিন্তু চোখ সরাল না বাবার মুখ থেকে। “তুমি একা এলে?”
“হ্যাঁ।”
“হেঁটে?”
“হ্যাঁ।”
তানিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “তাহলে আমরা দুজনেই ফাঁদে পড়লাম।” জলে চুমুক দিয়ে ও বলল, “ফিরে যাওয়ার রাস্তা আর নেই, বাবা।”
“মানে?” সমীর সোজা হয়ে বসলেন।
“মানে, এই যে—” তানিয়া ট্যাবলেটটা তুলে ধরল, “আমরা যেখানে আছি, সেটা একটা হান্টিং জ়োন। আর আমাদের ঘিরে ফেলা হয়েছে। অত্যন্ত ধীরে, নিখুঁতভাবে।”
সমীর থতোমতো খেলেন, “তুই কী বলছিস?”
“ওই যে: ওই মনোলিথগুলো।”
“মনোলিথগুলো তো নিছক…”
“নিছক গাছ? ছত্রাক? জীবাশ্ম?” তানিয়ার গলায় তিক্ততা, “তা-ই তো তুমি ভেবেছিলে। আমিও ভেবেছিলাম প্রথমে। কিন্তু বাবা, আমি দেখেছি। নিজের চোখে।”
“কী দেখেছিস?”
তানিয়া ট্যাবলেটটা নামিয়ে রাখল। “এই এক ঘণ্টা আগে একটা ‘স্ক্যাম্পার’ দেখলাম। এই গ্রহের ওই ছোট্ট চারপেয়ে প্রাণীগুলো। ধূসর লোমে ঢাকা, লম্বা ল্যাজ। বেশ নিরীহ। ঘাস আর পোকা খেয়েই থাকে।”
সমীর মাথা নাড়লেন।
“ওটা মনোলিথগুলোর মাঝখানে ঘুরছিল। কিছু একটা খুঁজছিল বোধহয়, মাটিতে নাক ঠেকিয়ে শুঁকছিল। আমি দূরে দাঁড়িয়ে স্ক্যান চালাচ্ছিলাম। ভাবলাম, প্রাণীটার আচরণ রেকর্ড করি। টেথিস প্রাইমের প্রাণীজগৎ নিয়ে আমাদের হাতে তথ্য খুব কম।”
তানিয়া আবার জলে চুমুক দিল। ওর হাত সামান্য কাঁপছিল।
“তারপর লক্ষ করলাম—মনোলিথগুলো একটু একটু করে কাছে এগিয়ে আসছে। এত ধীর গতিতে যে খালি চোখে ধরা পড়ে না। প্রথমে ভাবলাম হয়তো চোখের ভুল। কিন্তু আমি ট্যাবলেটে প্রতিটা মনোলিথের অবস্থান চিহ্নিত করে রাখলাম। অনেকটা টাইম-ল্যাপ্সের মতো—প্রতি দশ সেকেন্ডে একটা করে স্ন্যাপশট।”
সমীর নিশ্চুপ হয়ে শুনছিলেন। বুকের ভেতর অস্বস্তিটা ডালপালা মেলছে।
“তিরিশ মিনিট। স্ক্যাম্পারটা সেই জায়গাতেই ছিল, নির্বিঘ্নে খাচ্ছিল। আর মনোলিথগুলো…” তানিয়া ট্যাবলেটটা ঘুরিয়ে একটা অ্যানিমেশন চালু করল। স্ক্রিনে দেখা গেল নীল বিন্দুগুলো—প্রতিটা একেকটি মনোলিথ—ধীরে ধীরে একটা কেন্দ্রবিন্দুর দিকে সরে আসছে। কী সুশৃঙ্খল আর জ্যামিতিক সেই চলন!
“ওরা একটা বৃত্ত তৈরি করল। নিখুঁত বৃত্ত। তারপর…”
“তারপর কী?” সমীর জিজ্ঞেস করলেন।
“তারপর হঠাৎ মনোলিথগুলো নিমেষের মধ্যে অতিকায় দানবের আঙুল কিংবা দানবীয় শুঁড়ের মতো তির্যকভাবে নুইয়ে পড়ে স্ক্যাম্পারটাকে চারপাশ থেকে জাপটে ধরল। কোনো শব্দ নেই, কোনো আর্তনাদ নেই—কয়েক মুহূর্তের পৈশাচিক ক্ষিপ্রতায় প্রাণীটাকে টেনে নিয়ে মাটির নীচে সেঁধিয়ে গেল। ঠিক তার পরক্ষণেই, যেন ম্যাজিক! মাটি আবার বুজে গেল, আর মিনারগুলো মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আগের মতোই মাথা তুলে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। যেন কিচ্ছুটি হয়নি। কয়েক সেকেন্ড আগের সেই বীভৎসতার কোনো চিহ্নই সেখানে নেই।”
সমীর অস্বস্তিতে গলাখাঁকারি দিলেন। “তানিয়া, হয়তো ওটা একটা ‘সিংকহোল’ ছিল। এই গ্রহে অনেক জায়গাতেই মাটির নীচে গহ্বর থাকতে পারে। হঠাৎ ধসে পড়ে…”
তানিয়া তাঁর দিকে তাকাল। চোখে অসীম ধৈর্য, কিন্তু সেই সঙ্গে মিশে আছে চরম ক্লান্তি। “তুমি কি আমার কথা কখনোই বিশ্বাস করবে না, বাবা?”
সমীর মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তারপর অনুচ্চস্বরে বললেন, “তুই হয়তো একা ভয় পেয়েছিলি। ব্যাপারটা বড়োই…”
“অভাবনীয়? মনের ভুল?” তানিয়া একটু হাসল। ম্লান, করুণ হাসি। “আমিও তা-ই ভেবেছিলাম।”
“তা ছাড়া আর কী হতে পারে? ওই দেখ-না, ওগুলো তো মাথা উঁচু করেই দাঁড়িয়ে আছে এখনও…”
“কিন্তু বাবা, বিজ্ঞান আমাদের শেখায় অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান আর সংগৃহীত তথ্য—দুটোই সমান জরুরি। আমার কাছে এখন দুটোই আছে।”
সমীর কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তানিয়া হঠাৎ হাত তুলল। “শ্শ্শ!”
দূরে মনোলিথদের জঙ্গলে একটা ছোট্ট অবয়ব দেখা গেল। চারপেয়ে, ধূসর লোম, দীর্ঘ ল্যাজটা মাটি ছুঁইছুঁই করছে। একটা স্ক্যাম্পার। মাথা নীচু করে ঘাস খাচ্ছে।
তানিয়া ফিশফিশ করে বলল, “দ্যাখো। এখন দ্যাখো।”
সমীর নিশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইলেন।
প্রথম দশ মিনিট কিছুই ঘটল না। স্ক্যাম্পারটা দিব্যি নির্ভয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, মাথা নীচু করে ঘাস খুঁটছিল। মাঝে মাঝে লাফ দিয়ে একটু এগিয়ে যাচ্ছিল, ওর লম্বা ল্যাজটা দোলাতে দোলাতে। সমীর চোখ সরালেন না, তানিয়াও স্থির।
তারপর—খুব ধীরে, অতি অস্পষ্টভাবে মনে হল, মনোলিথগুলো নড়ে উঠল। কয়েক মিলিমিটার মাত্র। মিনারগুলোর দীর্ঘ ছায়া সামান্য বদলে গেল। সমীর নিজেকে প্রবোধ দিলেন—না, ওটা আলোর কারসাজি। কিন্তু পৃথিবীর মতোই এই গ্রহেও সূর্য তো এক জায়গায় স্থির!
আরও পাঁচ মিনিট কাটল। মনোলিথগুলো এবার ইঞ্চি ইঞ্চি করে এগিয়ে আসছিল—অসম্ভব ধীর, কিন্তু নিশ্চিত। স্ক্যাম্পারটার চারপাশে একটা প্রতিসম, সুশৃঙ্খল আর নিখুঁত বৃত্ত তৈরি হচ্ছিল। অথচ বেচারা প্রাণীটা টেরও পেল না, একবার মাথা তুলেও চাইল না।
তারপর—এক নিমেষে সব ওলট-পালট হয়ে গেল। মনোলিথগুলো হঠাৎ নুইয়ে পড়ল। প্রায় জীবন্ত ক্ষিপ্রতায়—দানবীয় হাতের আঙুলের মতো নুইয়ে পড়ল। ঠিক স্ক্যাম্পারটার পায়ের নীচের জমিটা ফেটে গেল। চারদিক থেকে মনোলিথগুলো কর্ষিকার মতো প্রাণীটাকে জাপটে ধরল, তারপর এক ঝটকায় মাটির নীচে টেনে নিয়ে গেল।
কোনো শব্দ হল না। কোনো ধস্তাধস্তি হল না। মাটি আবার আগের মতো বুজে গিয়ে মসৃণ হয়ে গেল—যেন কিচ্ছুটি হয়নি।
আর মনোলিথগুলো? মুহূর্তের মধ্যে সেগুলো আবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। নিঃসাড়, জড়, নির্বিকার।
সমীর লক্ষ করলেন, তাঁর হাত কাঁপছে।
“দেখলে?” তানিয়া ফিশফিশ করে বলল। ওর গলায় পাহাড়প্রমাণ ক্লান্তি আর আতঙ্ক।
সমীর কেবল মাথা নাড়লেন, মুখ দিয়ে কথা সরল না। দূরে কোনো এক মনোলিথ থেকে এল খুব মিহি এক ‘ক্রিক্’ শব্দ—পুরোনো কাঠের মটমটানির মতো।
গলাখাঁকারি দিয়ে সমীর বললেন, “আমাদের এখনই ফিরতে হবে।”
“কোথায় ফিরবে বাবা?” তানিয়া চারপাশের ধূসর প্রান্তরের দিকে চেয়ে বলল, “পথ তো আর নেই।”
“মানে?”
তানিয়া আঙুল উঁচিয়ে দেখাল। “ওদিকে তাকাও। যেদিক দিয়ে তুমি এসেছিলে।”
সমীর ঘুরে তাকাতেই তাঁর হৃৎস্পন্দন যেন থমকে গেল। মনোলিথগুলো অনেক কাছে সরে এসেছে। যে চওড়া ফাঁক দিয়ে তিনি ভেতরে ঢুকেছিলেন, তা এখন সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছে। গোটা ল্যান্ডস্কেপটাই বদলে গিয়েছে—কোথাও পথ রুদ্ধ, কোথাও তৈরি হয়েছে নতুন গোলকধাঁধা। ম্যাপে যা দেখেছিলেন, তার সঙ্গে এই দৃশ্যের কোনো মিল নেই।
“ওরা আমাদের ঘিরে ফেলছে,” তানিয়া বলল, “সময় নিয়ে, নিখুঁত হিসাব মেনে। আমরা এখানে বসে কথা বলছি, আর ওরা ধীরে ধীরে সরছে।”
“এই পাথুরে জায়গাটায় ওরা আসতে পারবে?” সমীর জিজ্ঞেস করলেন।
“হয়তো পারবে না। কিন্তু নিশ্চিত নই…”
“তানিয়া।” সমীর মেয়ের চোখের দিকে চাইলেন। তারপর শান্তস্বরে বললেন, “আমি অনেকদিন তোর কোনো কথা শুনিনি। সব সময় নিজের মতামত আর জেদ তোর উপর চাপিয়ে দিয়েছি। সব সময় চেয়েছি ডেটা, প্রমাণ আর বৈজ্ঞানিক যুক্তি। নিজের বিশ্বাস আর তথাকথিত জ্ঞানের পরিধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছি। এখন বল, তুই কী ভাবছিস? তোর তত্ত্ব কী?”
তানিয়া একটু সময় নিল। তারপর ট্যাবলেটে একটা ফাইল খুলে বলল, “দ্যাখো, মনে হয় এই মনোলিথগুলো আলাদা কোনো গাছ বা ছত্রাক নয়। এরা আসলে একটা বিশাল ভূগর্ভস্থ জীবের অংশ—হয়তো কিলোমিটার জুড়ে সেটা বিস্তৃত। এই মিনারগুলো ওর সেন্সর কিংবা চলাফেরার অঙ্গ। ওগুলো মাটির উপরের কম্পন, তাপ আর কার্বন ডাইঅক্সাইড ট্র্যাক করে শিকার ধরে।”
“আর যখন কোনো প্রাণী একা থাকে…”
“ঠিক। স্ক্যাম্পাররা একা থাকে বলেই সহজ শিকার। কিন্তু আমরা দুজন একসঙ্গে আছি, তাই হয়তো ওর হিসেবে একটু গোলমাল হচ্ছে।”
সমীর কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, “কিন্তু তানিয়া, আমরা তো জানি না এই জীবটার আচরণ ঠিক কেমন। হয়তো ও দলবদ্ধ শিকার করতেও অভ্যস্ত। আমাদের হাতে তো যথেষ্ট তথ্য নেই…”
তানিয়া ম্লান হাসল, “না, নেই। যা জানি, তার ভিত্তিতেই আমাদের কিছু একটা ভাবতে হবে। আমার বিকনটা হারিয়ে গেছে। স্পেসশিপ কতদূরে?”
সমীর নিজের বিকনটা চেক করে বললেন, “উত্তর-পুবে চার কিলোমিটার।”
“অর্থাৎ কোনদিকে যেতে হবে, সেটা জানি। কিন্তু মনোলিথগুলো পজ়িশন বদলে দেওয়ায় আগের চেনা পথটা হারিয়ে গিয়েছে।”
“তার মানে আমরা এখন আক্ষরিক অর্থেই খাঁচায় বন্দি।”
“হ্যাঁ,” তানিয়া বলল, “আমরা এখন হান্টিং জ়োনের ঠিক মাঝখানে। আর এই প্রাণীটা বা প্রাণীরা জেনে গিয়েছে, আমরা এখানেই আছি।”
সমীর চোখ বুজে পরিস্থিতিটা একবার ভেবে নিলেন। “বেস-এ একটা মেসেজ পাঠাব? রেসকিউ টিমের জন্য?”
“বাবা,” তানিয়া তাঁর দিকে তাকাল, “তুমি আর আমি দুজনেই প্রোটোকল ভেঙেছি। আমি একা এসেছি, তুমিও। উদ্ধারকারী দল এলে অনেক অপ্রীতিকর প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। তুমি কি সত্যিই তা চাও? আমরা এখান থেকেই ফেরার একটা পথ খুঁজে বার করব।”
সমীর একটু অবাক হয়ে মেয়ের দিকে চেয়ে মুচকি হাসলেন, “বাপের মতোই জেদি হয়েছিস, দেখছি।”
তানিয়া শুধু একটু হাসল।
সমীর সোজা হয়ে বসলেন। “তোর মাথায় কি কোনো পরিকল্পনা আছে?”
তানিয়া ট্যাবলেটের স্ক্রিনে আঙুল চালিয়ে ম্যাপটা জ়ুম করল। সেখানে অনেকগুলো লাল-নীল রেখা আর জ্যামিতিক নকশা আঁকা। ও বলল, “একটা প্ল্যান আছে, বাবা। কিন্তু কাজটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আর সফল হবেই—এমন গ্যারান্টিও আমি দিতে পারছি না।”
“বল। শুনি।”
“আমি গত তিন ঘণ্টা ধরে মনোলিথদের খুব কাছ থেকে দেখছি। বাইরে আসার আগে স্যাটেলাইট আর ড্রোন দিয়েও ওদের উপর নজর রেখেছি।” তানিয়া বলল, “ওদের গড় উচ্চতা দশ থেকে পনেরো মিটার, প্রস্থ বড়োজোর এক মিটার। কিন্তু এই শিকারের ব্যাপারটা তো আগে জানতাম না। আসল রহস্যটা হল—ওরা কীভাবে শিকার চিহ্নিত করে।”
“তাপ, কম্পন আর কার্বন ডাইঅক্সাইড?”
“ঠিক—এই তিনটের একটা নির্দিষ্ট ‘ওভারল্যাপ’ বা সমন্বয়। যখন কোনো প্রাণী একটা নির্দিষ্ট এলাকায় থাকে—মোটামুটি পাঁচ ফুট ব্যাসার্ধের ভেতর—এবং সেখানে বেশ খানিকটা সময় কাটায়, তখনই মনোলিথগুলো ওকে ‘লক’ করে ফেলে। তারপর—” তানিয়া আঙুল দিয়ে বাতাসে একটা বৃত্ত আঁকল, “তারপর ওরা চারপাশ থেকে এগিয়ে এসে বৃত্ত সম্পূর্ণ করে। আর সেই জ্যামিতিক বেষ্টনী একবার তৈরি হয়ে গেলে পালানোর আর কোনো পথ থাকে না।”
“তার মানে…”
“যদি আমরা ক্রমাগত চলতে থাকি এবং নিজেদের মধ্যে একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখি—ধরো ছয় ফুট বা দুই মিটারের মতো—তাহলে আমাদের শরীরের তাপ আর পায়ের কম্পনটা ছড়িয়ে পড়বে। ওদের সেন্সর এতে বিভ্রান্ত হয়ে যাবে। কোনো একক টার্গেট হিসেবে আমাদের ওরা চিহ্নিত করতে পারবে না।”
সমীর চিন্তাচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন, “কিন্তু তানিয়া, এটা নিছক একটা হাইপোথেসিস। তুই বড়োজোর একটা বা দুটো ঘটনা দেখেছিস। স্যাম্পল সাইজ় বড়োই…”
“বাবা!” তানিয়া তাঁকে থামিয়ে দিল, “প্যাটার্নটা কিন্তু খুব সুনির্দিষ্ট। আমি দেখেছি—স্ক্যাম্পাররা যখন একা থাকে, তখনই শিকার হয়। কিন্তু দুটো স্ক্যাম্পারকে কাছাকাছি দেখলাম, এমনকি দুই-তিন মিটার দূরত্বে চললেও মনোলিথরা তাদের আক্রমণ করছে না। এটা স্রেফ কাকতালীয় হতে পারে না।”
“কিন্তু…”
“পৃথিবীর প্রেইরি ডগরাও এভাবেই আত্মরক্ষা করে। যখন কোনো শিকারি আসে, ওরা একে অপরের থেকে একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে ছড়িয়ে পড়ে। একা থাকে না কখনোই। কারণ, একা থাকলে ইগ্ল বা কোয়োটির টার্গেট হওয়া সহজ। কিন্তু দুজন মিলে থাকলে সিগন্যাল গুলিয়ে যায়। শিকারি ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, কাকে আগে আক্রমণ করবে।”
সমীর চুপ করে রইলেন। তানিয়া ঠিকই বলছে। প্রাণীজগতে এই কৌশল বিরল নয়, বরং বেশ কার্যকর।
“আর এখানেও” তানিয়া বলে চলল, “মনোলিথগুলোও একই নিয়মে কাজ করছে। ওরা জ্যামিতিক হিসাব মেনে চলে। যদি আমরা সেই জ্যামিতিটা ভেঙে দিতে পারি—অর্থাৎ, সব সময় ‘মুভিং টার্গেট’ হিসেবে থাকি এবং কখনোই ওদের ‘লক-ইন রেডিয়াস’-এ স্থির না হই—তাহলে আমাদের একটা সুযোগ আছে।”
“কিন্তু ঝুঁকিটা তো সাংঘাতিক…”
“জানি। কিন্তু বাবা, এভাবে বসে থাকলেও তো নিশ্চিত মৃত্যু। ওরা এগোচ্ছে। হয়তো আর ঘণ্টা দুয়েক, বড়োজোর তিন ঘণ্টা। এই পাথুরে জমির তলা থেকেই হয়তো ওরা আক্রমণ করবে। তখন এই পাথরের আশ্রয়ও আর আমাদের বাঁচাতে পারবে না।”
সমীর চারপাশটা দেখে নিলেন। মনোলিথগুলো সত্যিই অনেক কাছে চলে এসেছে। ছায়াগুলো দীর্ঘতর হচ্ছে, সূর্য হেলে পড়েছে দিগন্তে।
“তুই কতটা নিশ্চিত?” সমীর জিজ্ঞেস করলেন।
“সত্তর শতাংশ,” তানিয়া বলল, “হয়তো পঁচাত্তর।”
“বিজ্ঞানের হিসেবে এটা খুব কম…”
“জানি। কিন্তু এই মুহূর্তে এটাই একমাত্র পথ, যা আমার মাথায় এসেছে।”
সমীর মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তানিয়ার ধুলো-মাখা শ্রান্ত মুখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। চোখে আতঙ্ক নেই, আছে গভীর প্রত্যয়।
তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “ঠিক আছে। তা-ই হোক।”
তানিয়া একটা চাপা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলল, “তাহলে চলো। আমাদের এখনই রওনা হতে হবে।”
* * *
প্রথম পদক্ষেপটাই ছিল সব চেয়ে কঠিন।
“ঠিক ছয় ফুট,” তানিয়া বলল, “আমি গুনব। তুমি শুধু আমার সঙ্গে তাল মেলাও।”
সমীর মাথা নাড়লেন। হাতে ধরা স্ক্যানারটা পকেটে পুরে রাখলেন; ওটার উপযোগিতা এখন ফুরিয়েছে। এখন একমাত্র সম্বল তানিয়ার কণ্ঠস্বর, ওর নিখুঁত হিসেব আর অদম্য বিশ্বাস।
“এক। দুই। তিন।” তানিয়া গুনতে শুরু করল। ধীর, স্থির, ছন্দবদ্ধ।
দুজন হাঁটা শুরু করলেন। পা ফেলছেন অতি সাবধানে। তানিয়া আগে, সমীর পিছনে—ঠিক দুই মিটারের ব্যবধান। তার বেশিও নয়, কমও নয়।
প্রথম কয়েক মিনিট কাটল নির্লিপ্তভাবে। চারপাশে মিনারগুলো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে, যেন ধ্যানমগ্ন। কেবল বাতাসের দীর্ঘশ্বাস আর তানিয়ার কণ্ঠস্বর—“চার। পাঁচ। ছয়।”
হঠাৎ সমীর দেখলেন—একটা মনোলিথ নড়ল। যেন গভীর ঘুম থেকে আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠছে। মিনারটা সামান্য নুইয়ে পড়ল তাঁদের দিকে।
“তানিয়া…”
“দেখেছি, বাবা। চলতে থাকো। থেমো না। ছন্দ ভেঙো না।”
আরও একটা মিনার নড়ল। তারপর আরও একটা। চারপাশ থেকে জেগে উঠছে সেই অতিকায় ভূগর্ভস্থ জীব। পায়ের নীচের মাটি থেকে একটা অদ্ভুত মড়মড় শব্দ ভেসে এল—ঠিক যেন শুকনো কাঠে ফাটল ধরছে। দেখা গেল, মাটি ফুঁড়ে বেরোচ্ছে নতুন সব মিনার, যেগুলো আগে ছিল না। ফ্যাকাশে, লম্বা আঙুলের মতো সেগুলো যেন তাঁদের ছুঁতে চাইছে।
“সাত। আট। নয়।” তানিয়ার স্বর এখনও স্থির, তবে গতি বেড়েছে।
অদৃশ্য বৃত্তটা ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে আসছে। সমীর বুঝলেন, ওরা ঘিরে ফেলছে। দশটা, বিশটা, পঞ্চাশটা মিনার—চারপাশ থেকে নিঃশব্দে ধেয়ে এসে একটা জীবন্ত খাঁচা তৈরি করছে।
“তানিয়া! ওরা আরও দ্রুত নড়ছে!”
“জানি!” তানিয়া বলল, “বড়ো শিকার দেখে ওরা কৌশল বদলেছে! কিন্তু জ্যামিতিটা হয়তো একই আছে! দূরত্ব ঠিক রাখো!”
সমীরের শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু তিনি পা ফেলছেন তানিয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে।
“দশ, এগারো, বারো…”
হঠাৎ পায়ের তলার জমিটা ভীষণভাবে কেঁপে উঠল। সমীর ভারসাম্য হারিয়ে হোঁচট খেলেন। সামনের পা-টা এক কদম বেশি এগিয়ে গেল। ব্যবধানটুকু ঘুচে গেল মুহূর্তেই।
“বাবা, না—!”
মাটি ফেটে গেল তাঁর পায়ের ঠিক পাশেই একটা কালচে কর্ষিকা উঠে এল—মোটা, মাংসল। স্ক্যাম্পার ধরার সময়ের চেয়েও অনেক বেশি ক্ষিপ্রতায় ওটা সমীরের দিকে ধেয়ে এল। দানবটা এবার পুরোপুরি জেগে উঠেছে; সে জানে—এই শিকার আকারে বড়ো, তাই বিপজ্জনক।
কর্ষিকাটা সমীরকে জাপটে ধরার ঠিক আগেই তানিয়া পিছন থেকে ছুটে এসে তাঁর হাত ধরে সজোরে টান দিল। “ওঠো! ওঠো এখনই!”
সমীর ওঠার চেষ্টা করলেন, কিন্তু বালিতে পা পিছলে গেল। মাটি আরও ফাটছে। এক, দুই, তিন—একাধিক কর্ষিকা মাটির নীচ থেকে বেরিয়ে আসছে। উপরের মনোলিথগুলো দানবীয় আঙুলের মতো বেঁকে এসে তাঁদের পিষে ফেলতে চাইছে।
“তানিয়া… দৌড়ো,” সমীর চিৎকার করে উঠলেন, “এখনই।”
“না! তোমাকে ফেলে আমি যাব না…”
“শোন, এটাই তোর থিয়োরি! আমরা আলাদা হয়ে গেলে ওরা লক করতে পারবে না!” তানিয়া এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়াল। বাবার চোখে চোখ পড়ল তার। সেই দৃষ্টির অর্থ বুঝে নিয়ে ও ঘুরে দৌড় দিল—উত্তর-পূর্বদিকে, জাহাজের দিকে।
মনোলিথগুলো যেন হঠাৎ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল। দুটো টার্গেট। দুটো ভিন্ন দিক। কোনটা ধরবে?
জ্যামিতিক বৃত্তটা ভেঙে গেল। কিছু মিনার সমীরের দিকে ঝুঁকছে, কিছু তানিয়ার দিকে। কিন্তু কেউই আর সেই মরণবৃত্ত সম্পূর্ণ করতে পারল না।
সমীর উঠে দাঁড়ালেন। গায়ের ধুলো ঝেড়ে সর্বশক্তি দিয়ে দৌড়োতে শুরু করলেন। চারদিকে মাটি ফাটছে, কর্ষিকা উঠছে অগণিত। মনোলিথগুলো পথ আটকে দাঁড়াচ্ছে। এমন অবিশ্বাস্য জ্যামিতি কোনো প্রাকৃতিক নিয়মে চলে না।
“বাবা! ডানদিকে!” তানিয়ার তীক্ষ্ণ চিৎকার কানে এল।
বিদ্যুদ্গতিতে ছুটলেন সমীর। একটা কর্ষিকা প্রায় তাঁর পা ছুঁয়ে ফেলেছিল, কিন্তু তিনি একলাফে ওটা ডিঙিয়ে গেলেন।
তানিয়া এগিয়ে যাচ্ছে—হাতে কোনো যন্ত্র নেই, কোনো ম্যাপ নেই। শুধু সহজাত প্রবৃত্তি দিয়ে ও পথ চিনে নিচ্ছে। যেন এই অচেনা গ্রহের আদিম ভাষা ও বুঝে ফেলেছে। সমীরও পিছু নিলেন। মনে কোনো প্রশ্ন নেই, কেবল বিশ্বাস।
তানিয়া চেঁচিয়ে বলল, “ওপাশে একটা ফাঁকা চত্বর!”
“আর কতদূর?”
“খুব বেশি নয়!”
সমীর দেখলেন—সামনে মনোলিথদের একটা শেষ দেওয়াল। কিন্তু তার ওপারেই দেখা যাচ্ছে শক্ত পাথুরে জমি।
তাঁরা দৌড়োলেন। মনোলিথগুলো আপ্রাণ চেষ্টা করল তাঁদের গতিপথ রুদ্ধ করার, কিন্তু সেই নির্দিষ্ট ‘লক-ইন’ রেডিয়াস আর ফিরে এল না। শিকার এখন ওদের নাগালের বাইরে।
হঠাৎই সব থেমে গেল। মিনারগুলো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। সমীর থামলেন। বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। তানিয়াও দাঁড়িয়ে পড়ল। পিছন ফিরে দেখলেন—মনোলিথগুলো আবার আগের মতো নিষ্ক্রিয়। শিকার হাতছাড়া হওয়ায় ওরা যেন আবার সেই আদিম তন্দ্রায় মগ্ন হয়েছে। এবার অপেক্ষা নতুন শিকারের।
সমীর হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন। তানিয়া পাশে বসল। ওর হাত-পা কাঁপছিল।
সমীর দূরে তাকালেন। তাদের জাহাজটা দেখা যাচ্ছে। যেন নিরাপত্তার ধ্রুবতারা। জাহাজের পাশে একটা ছায়ামূর্তি হাত নাড়ছে। অর্ণব।
সমীর শব্দ করে হেসে উঠলেন। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে তানিয়ার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন।
“চল,” তিনি বললেন, “এবার ফেরার পালা।”
তানিয়া বাবার হাত ধরল। দুজন একসঙ্গে হাঁটতে শুরু করলেন। এবার আর কোনো ছন্দ মেলাতে হল না, কোনো কদম গুনতে হল না। শুধু বাবা আর মেয়ে। পাশাপাশি।
মনোলিথগুলো পিছনে পড়ে রইল—প্রোথিত, নিথর, মাটির গভীরে অক্টোপাসের মতো শিকড় ছড়িয়ে। সমীর বুঝলেন, মানুষও তো অনেক সময় এভাবেই প্রোথিত থাকে—নিজের বিশ্বাস আর অহংকারের নীচে। সেই শিকড় উপড়ে ফেলে নতুন মাটির ঘ্রাণ নিতে পারাতেই তো প্রকৃত মুক্তি।
Tags: একাদশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা, সায়ন দাস
