সম্পাদকীয়
লেখক: কল্পবিশ্ব সম্পাদকমন্ডলী
শিল্পী: টিম কল্পবিশ্ব
আশি নব্বইয়ের দশক। তখনো দুনিয়াটা এইভাবে কম্পিউটার আর মুঠোফোনের দখলে চলে যায়নি। গ্রীষ্মের ছুটির দুপুরে বই খুলে বসে হারিয়ে যাওয়া যেত যখের ধনের সন্ধানে, অথবা রোবার দ্যা কনকারারের আকাশযানে। উত্তর মেরু থেকে মঙ্গলগ্রহের দূরত্ব ছিল খাট থেকে বইয়ের আলমারির। কখনো সখনো টিভিতে ছুটির অনুষ্ঠানে দেশ বিদেশের অ্যাডভেঞ্চার সিনেমা বা বাবা-মা-এর সাথে পার্কস্ট্রিটে ইংরেজি সিনেমা – স্টার ওয়ার্স, কিং সলোমন মাইন্স, রেইডার্স অফ দ্যা লস্ট আর্ক বা ইনার স্পেস। সিনেমার পরে পার্কস্ট্রিটে রেস্টুরেন্টে খেয়ে ঘুম ঘুম চোখে বাড়ি ফেরাটাও কি কম অভিযান? তারপর পৃথিবীটা কবে যেন ছোট হতে হতে হাতের মুঠোয় ধরে গেল। বিশ্বায়নের যুগে সবাই জেনে গেল সবকিছুই। অচেনা, অজানা আমাজানের জঙ্গল কেটে বসল কারখানা, সমুদ্রের কুড়ি হাজার লিগ নিচেও পাওয়া গেল প্লাস্টিকের বিষ – আর আমরা ভুলে গেলাম অবাক হতে। ঘনাদা, প্রফেসর শঙ্কু, টেনিদা বা বিমল কুমার কি আর এখনকার প্রজন্মকে আগের মত টানে?
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের দিকে তাকালে অ্যাডভেঞ্চার কল্পবিজ্ঞানের গল্প বলা যায় ‘শুক্র ভ্রমণ’-কেই। ১৮৯৫ সালে জগদানন্দ রায় রচিত এই গল্পটিতে দুই বন্ধু পৌঁছে যান শুক্র গ্রহে। সেখানকার সভ্য ও অসভ্য জাতিদের সাথে তাদের সাক্ষাত আর অভিযান বেশ মনোগ্রাহী। তখনো কিন্তু ভীনগ্রহীদের অভিযান নিয়ে ওয়ার অফ দ্যা ওয়ার্লডস লেখা হয়নি ওয়েলসের। বিজ্ঞানভিত্তিক অ্যাডভেঞ্চার নিয়ে প্যারোডি করেছেন সুকুমার রায় তাঁর হেসোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরিতে। মূলত কোনান ডয়েলের প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের দুর্গম মহাদেশে শ্বেতাঙ্গ অভিযাত্রীর অ্যাডভেঞ্চার রোম্যান্টিসিজমেরই ব্যাঙ্গাত্মক রুপান্তর এই গল্পটি। প্রেমেন্দ্র মিত্র ও হেমেন্দ্র কুমার রায় এই সময় চুটিয়ে লিখেছেন বিজ্ঞানভিত্তিক অ্যাডভেঞ্চার। বিভূতিভূষণের চাঁদের পাহাড় তো আমাদের মনে চিরকালীন জায়গা করে নিয়েছে। তবে ঘনাদা এসে যেন এই সব অভিযানকে এক ঝটকায় পিছনে ফেলে দিলেন। বাঙালির নিজের নায়ক, তাঁর অজানা কিছুই নেই, দেশ বিদেশের নানা বিপদ থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করতে ছুটে যান, তাবড় সব বৈজ্ঞানিক ও দেশনেতাদের সাথে তাঁর ওঠা বসা। অবলীলায় তিনি ছুটে যান পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে মহাকাশেও। বিজ্ঞান, ইতিহাস আর ভূগোলের তুখোড় ককটেলের অ্যাডভেঞ্চার বাঙালি এর আগে দেখেনি। এই সময়েই জুল ভের্নের সেরা অভিযানের কাহিনিগুলি বাংলায় অনুবাদও হয়েছে।
সত্যজিৎ রায়ের শঙ্কু কাহিনিগুলি বিজ্ঞান ও ফ্যান্টাসির সাথে অ্যাডভেঞ্চারকে মিশিয়ে সব বয়সের পাঠকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠল। তারপর থেকে অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় বৈজ্ঞানিক আরো অনেক এসেছে কল্পবিজ্ঞানে – প্রফেসর নাটবল্টুচক্র বা স্যার সত্যপ্রকাশ। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার প্রমুখ মূলধারার লেখার পাশাপাশি বেশ কিছু কল্পবিজ্ঞানভিত্তিক অভিযানের গল্প লিখেছেন। আধুনিক সময়ে হিমাদ্রীকিশোর দাসগুপ্তের ক্রিপ্টিড সিরিজ, দেবজ্যোতি ভট্টাচার্যের বিষবৈদ্য এবং অভিজ্ঞান রায়চৌধুরীর অনিলিখা সিরিজ এই ধারাকে বয়ে নিয়ে চলেছে।
তবে চিন্তার বিষয় বিশ্ব সাহিত্যে অভিযান গল্পের ধারা এখন পৃথিবীর অনাবিষ্কৃত রহস্য ছাড়িয়ে অনেক দূরে এগিয়ে গেছে। আমরা যদি এই ধরণের গল্পের শ্রেনীবিভাগ করতে চাই তাহলে তা এরকম হতে পারে –
১) মহাকাশের অভিযান
২) অন্য গ্রহে অভিযান
৩) অন্য গ্রহের জীবের সাক্ষাৎ
8) বৈজ্ঞানিক অভিযান
৫) প্রযুক্তিগত অ্যাডভেঞ্চার (সাইবার-স্পেসে, বা অ্যাট্মিক স্পেসে বা মানুষের মনের ভিতর)
৬) সময় অভিযান
৭) প্রতিকূল পরিবেশে অ্যাডভেঞ্চার (জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বা কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জন্যে)
কিন্তু এখনো পর্যন্ত বাংলা কল্পবিজ্ঞানে বৈজ্ঞানিক অভিযানের উপরেই সিংহভাগ লেখা হয়েছে। আশ্চর্যের ব্যাপার এই ২০২৬ সালে এসেও মহাকাশ অভিযান নিয়ে বা সাইবার স্পেস নিয়ে সেরকম কোনও বড় লেখা আমরা পাচ্ছি না। সময় অভিযান নিয়ে সোহম গুহর ট্রিলোজি এর মধ্যে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। প্রযুক্তিগত অ্যাডভেঞ্চার নিয়ে ঋজু গাঙ্গুলীর জন-ট্যান সিরিজের উল্লেখ করতে হয়।
বাংলায় ফ্যান্টাসির অ্যাডভেঞ্চারের মধ্যে প্রথমেই মনে আসে ত্রৈলোক্যনাথের কঙ্কাবতী আর শৈলেন ঘোষের বিভিন্ন গল্পের কথা। এই সময়ে এই ধারায় সার্থক গল্প লিখছেন সৌম্যসুন্দর মুখোপাধ্যায়।
এই সংখ্যায় রইল কল্পবিজ্ঞান আর ফ্যান্টাসি ভিত্তিক অ্যাডভেঞ্চার নিয়ে নানা স্বাদের গল্প ও প্রবন্ধ। বিশ্বসাহিত্যের কিছু অবশ্যপাঠ্য অ্যাডভেঞ্চার গল্পের খোঁজ দিয়েছেন ঋজু গাঙ্গুলি। মঙ্গলগ্রহ অভিযান ও ভীনগ্রহীদের সাথে মোলাকাতের গল্প নিয়ে লেখা স্ট্যানলি জি. ওয়েনবামের লেখা ‘এ মার্শিয়ান ওডিসি’কে কল্পবিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী গল্প হিসেবে দেখা হয়, সেই গল্প থাকছে রাকেশকুমার দাসের অনুবাদে। এই গল্প থেকেই সায়েন্স ফিকশন গল্পে ভিনগ্রহীদের নির্মাণ বদলাতে শুরু করে। অপার্থিব জগতেও মানবিকতার গল্প শুনিয়েছেন অনুষ্টুপ শেঠ। মহাকাশ-যুদ্ধ যা মিলিটারি সাই-ফাই গোত্রের উপন্যাস ‘নীরব মহাকাশ’, সহস্র যোজন ও কালের দীর্ঘ ব্যবধ্যানেও শীতল নিষ্ঠুরতার মধ্যে সম্পর্কের উষ্ণতার ছোঁয়াচ এনেছেন কৃশানু নস্কর। সমুদ্রের অতলে অজানা রহস্য সমাধানে আপনাকে নিয়ে যাবে ‘উর্ধ্বসীমা’ ও ‘গহ্বরের ঘড়ি’। মানুষের মনের জগতে স্মৃতিপথ-অভিযান নিয়ে রয়েছে ‘পিছাবনী’ ও ‘দ্যা লস্ট পেইন্টিং’ গল্পদুটি। অতিপ্রাকৃত অ্যাডভেঞ্চার ‘সুপারন্যাচারাল’ সিরিজটির নানা দিক বিশদে আলোচনা করেছেন প্রিয়াংকা মিত্র। এছাড়াও রয়েছে ভিন্নস্বাদের নানা কল্পবিজ্ঞান গল্প, প্রবন্ধ, বই ও সিরিজের প্রতিক্রিয়া ইত্যাদি। এই সংখ্যা থেক শুরু হল একটি ফ্যান্টাসি অ্যাডভেঞ্চার মূলক ধারাবাহিক উপন্যাস, আপনারাই জানান কেমন লাগল খ, অখ আর নখ্দের দুনিয়া। আশা করি আগামী দিনে উল্লেখিত সমস্ত উপধারা নিয়েও অ্যাডভেঞ্চার গল্প লেখা হবে।
গত পুজোসংখ্যার পরে কল্পবিশ্ব বেশ কিছু বড় অনুষ্ঠান করেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে আমরা ৩ দিনের ক্লাইমেট ফিকশনের উপর আন্তর্জাতিক কনভেনশন করেছি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও আই আই এমের সাথে। এরপর বইমেলা ২০২৬ সালে আশ্চর্য ও ফ্যান্টাসটিক পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছেন যথাক্রমে শ্রী অমিতানন্দ দাশ ও ঋজু গাঙ্গুলী। তৈরি করা শুরু হয়েছে কল্পডিবি ডট কম, ভারতের প্রথম স্পেকুলেটিভ ফিকশন ডেটাবেস। এই সবকিছু নিয়েই অনেক বিস্তারিতভাবে জানা যাবে আগামী পুজোসংখ্যায়। পুজোসংখ্যার কাজ চলছে পুরোদমে। ষষ্ঠীর আগেই বছরের সেরা কল্পবিজ্ঞান ও ফ্যান্টাসি নিয়ে হাজির হব আমরা। ততদিনে আমাদের অবশ্যই জানান এই সংখ্যাটি কেমন লাগল। আপনাদের পাঠ শুভ হোক।
Tags: একাদশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা

